‘আল্লাহ জানেন, আমরা কীভাবে বাঁচব’

‘আল্লাহ জানেন, আমরা কীভাবে বাঁচব’
স্থলমাইনে পা হারানো আহত হানিফের মা জাহানারা বেগম | ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ হানিফ (২৬) আর কখনো আগের মতো নাফ নদীতে নামতে পারবেন না। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের রেশ টেনে আনা একটি স্থলমাইন চিরতরে কেড়ে নিয়েছে তার বাম পা।

সোমবার সকালে মাছ ধরতে গিয়ে নাফ নদীর বাংলাদেশ অংশে পা রাখতেই ঘটে বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার পায়ের গোড়ালি। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা হানিফের চোখে এখনো ভাসছে সেই ভয়াল মুহূর্ত। পাশে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন স্ত্রী সুফাইরা বেগম। তার কণ্ঠে শুধুই নিরবতা আর হতাশা। বুঝে ওঠতে পারছেন না তিনি কী করবেন।

আহত মোহাম্মদ হানিফের পিতা ফজল করিম কাঁপা গলায় টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ছেলেটাই ছিল সংসারের একমাত্র ভরসা। এখন সে নিজেই অসহায়। কীভাবে চলবে আমাদের পরিবার।’

মঙ্গলবার দুপুরে হোয়াইক্যং লম্বাবিল পশ্চিমপাড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হানিফের বাড়ির উঠানজুড়ে নীরবতা। নদীর ঢেউয়ের শব্দের সঙ্গে মিশে আছে তার মায়ের কান্না। প্রতিবেশীরাও সান্ত্বনা দিতে পারছেন না–কারণ, সবার চোখে একই আতঙ্ক, কখন আবার গুলি বা মর্টার শেল এসে পড়ে।

আহত হানিফের মা জাহানারা বেগম টাইমসকে বলেন, ‘আমার ছেলেটা আর নদীতে নামতে পারবে না। আল্লাহ জানেন, আমরা কীভাবে বাঁচব।’

অন্যদিকে, হোয়াইক্যং তেচ্ছিব্রিজ সংলগ্ন নাফ নদীঘেঁষা সীমান্তের আরেক প্রান্তে একই আতঙ্কে দিন কাটছে স্কুলছাত্রী হুজাইফা সুলতানা আফনানের পরিবারের। মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছোড়া গুলিতে আহত এই শিশুটি এখনো চিকিৎসাধীন।

ছবি: টাইমস

মঙ্গলবার বিকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার খবরে শিশুটির বাবা জসিম উদ্দিন কান্নায় ভেঙে পড়েন। মেয়ের সুস্থতা কামনায় পরিবারে পবিত্র কুরআন খতম ও দোয়ার আয়োজন করা হয়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে জসিম উদ্দিন টাইমসকে বলেন, ‘আমার মেয়ের কী দোষ ছিল? সে তো শুধু স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিল। বই হাতে নিয়ে বারবার জিজ্ঞেস করে–‘আমার মেয়ে কি আবার স্কুলে যেতে পারবে?’

আরও পড়ুন

আফনানের পরিবারসহ আশপাশের ঘরগুলোতে এখন আর বই খোলা হয় না। সীমান্তের ওপার থেকে ভেসে আসা প্রতিটি বিকট শব্দে চমকে ওঠে শিশুরা। আতঙ্কে অনেকেই রাতে ঘুম ভাঙলে মায়ের হাত আঁকড়ে ধরে।

লম্বাবিল সীমান্ত এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অনেক পরিবার ভয়ে ঘরে তালা ঝুলিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।

হোয়াইক্যং লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজ এলাকার বাসিন্দা আবু তাহের টাইমসকে বলেন, ‘মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে হঠাৎ একটি গুলি এসে আমার ঘরের জানালায় পড়ে। আমরা আর নিরাপদ বোধ করছি না।’

একই এলাকার দিনমজুর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না। আমরা শুধু বাঁচতে চাই।’

গুলির শব্দ, মর্টার শেল আর বিস্ফোরণের কম্পনে হোয়াইক্যং ও পালংখালীর অন্তত ১১টি গ্রাম এখন আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। মানুষ রাতে ঘুমাতে পারছে না, অনেকেই এলাকা ছাড়ছে।

এই আতঙ্ক আর নিরাপত্তাহীনতার প্রতিবাদে সোমবার সকালে হোয়াইক্যং লম্বাবিল তেচ্ছি ব্রিজ এলাকায় স্থানীয়রা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। একই দিন রাতে হোয়াইক্যং বাজারে মাশাল মিছিল করেছে স্থানীয় ছাত্রজনতা। প্রতিবাদ সমাবেশে তারা সীমান্তে নির্বিচার গুলি বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে পালিয়ে বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে আটক রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৫২ সদস্যকে আদালতে হলে আদালত জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে আদালত সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে টেকনাফ থানা থেকে তাদের কক্সবাজার জেলা আদালতে পাঠানো হয়। এদের মধ্যে একজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, রোববার হোয়াইক্যং লম্বাবিল সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে বিজিবি মোট ৫৭ জনকে আটক করে। যাচাই-বাছাই শেষে নাফ নদীতে মাছ আহরণকারী দুই বাংলাদেশি নাগরিকসহ চারজন নিরীহ ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, অবশিষ্ট ৫৩ জনের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশ আইনে মামলা করা হয়। মামলার এক আসামি গুরুতর আহত হওয়ায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। মঙ্গলবার আদালতে ৫২ জনকে হাজির করা হয়।

এদিকে মঙ্গলবার বিকালে গুলিবিদ্ধ শিশু হুজাইফা আফনান ও স্থলমাইন বিস্ফোরণে আহত মোহাম্মদ হানিফের সুচিকিৎসার দাবিতে টেকনাফে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

টেকনাফ সদর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ মিছিলটি পৌরসভার শাপলা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। বক্তারা সীমান্তে আরাকান আর্মির হামলা বন্ধ, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচল বন্ধের দাবি জানান।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর