এবার উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ যেন শুরুর আগেই উপহার দিচ্ছে এক রূপকথার গল্প। মাঠের লড়াই গড়ানোর আগেই ফুটবলপ্রেমীদের নজর কেড়েছে আলজেরিয়া দল। আর তা কোনো সাধারণ কারণে নয়; দলটিতে রয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহানায়ক জিনেদিন জিদানের মেজ ছেলে লুকা জিদান।
পিতার পৈতৃক ভিটেমাটি আলজেরিয়ার টানে ফ্রান্স ছেড়ে এবার মরুভূমির শেয়ালদের (লেস ফেনেক্স) প্রতিনিধি হয়ে বিশ্বকাপে এসেছেন এই গোলরক্ষক। তবে আলজেরিয়ান সমর্থকদের মনে এখন একটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হাইভোল্টেজ উদ্বোধনী ম্যাচে কি দেখা যাবে জিদান-তনয়কে? তিনি কি থাকছেন প্রথম একাদশে?
প্রথম একাদশে থাকা নিয়ে ধোঁয়াশা
আলজেরিয়া শিবিরের ভেতরের খবর, আর্জেন্টিনার শক্তিশালী আক্রমণভাগ রুখে দিতে লুকা জিদানকে শুরুর একাদশে রাখা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি দলের প্রধান কোচ। একদিকে লুকার ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের অভিজ্ঞতা ও দুর্দান্ত রিফ্লেক্স, অন্যদিকে জাতীয় দলে তার চেয়ে অভিজ্ঞ অন্য গোলরক্ষকদের দাবি।
বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটি আলজেরিয়ার জন্য বাঁচা-মরার লড়াই। লিওনেল মেসির উত্তরসূরিদের রুখতে কোচ কি লুকার ওপর ভরসা করবেন, নাকি অভিজ্ঞতার দিকে ঝুঁকবেন—তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে ফুটবল পণ্ডিতদের মতে, লুকাকে প্রথম একাদশে দেখা গেলে তা হবে এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা চমক।
ফরাসি নীল থেকে আলজেরিয়ার সবুজ: এক আবেগের রূপান্তর
লুকা জিদানের ফুটবল যাত্রাটা কিন্তু আলজেরিয়ার জার্সিতে শুরু হয়নি। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতানো জিনেদিন জিদানের ঘরে জন্ম নেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই লুকা বড় হয়েছেন ফরাসি ফুটবল সংস্কৃতির আবহে। ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৮ এবং অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে গোলপোস্ট সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে তার। এমনকি ২০১৫ সালে ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের স্বাদও পেয়েছেন।
তবে রক্ত তো কথা বলবেই! বাবা জিনেদিন জিদানের মা-বাবা ১৯৬৩ সালে আলজেরিয়ার আকবু অঞ্চল থেকে ফ্রান্সে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ফলে লুকার শরীরে বইছে আলজেরিয়ান রক্ত। ফিফার নিয়ম মেনে এবং নিজের পিতৃভূমির প্রতি টান থেকে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের সিনিয়র দলের আশা ছেড়ে আলজেরিয়াকে বেছে নেন এই স্প্যানিশ ক্লাব গ্রানাদার গোলরক্ষক।
পিতা জিনেদিন জিদান: এক বিশাল ছায়া
লুকা যখনই মাঠে নামেন, তার নামের পাশে যুক্ত থাকে ‘জিদান’ নামক এক বিশাল পর্বত। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় কিংবা ফ্রান্সকে বিশ্বসেরা করা জিনেদিন জিদানের ছেলে হওয়াটা যেমন গর্বের, তেমনি এক দিক থেকে প্রচণ্ড চাপের। লুকা নিজে একজন গোলরক্ষক হওয়ায় বাবার পজিশন (মিডফিল্ডার) থেকে নিজেকে আলাদা করতে পেরেছেন ঠিকই, কিন্তু ক্যামেরার চোখ সবসময় তার দিকেই থাকে। আলজেরিয়ার জার্সিতে বাবার সেই অধরা আন্তর্জাতিক অধ্যায়কে পূর্ণতা দেওয়াই এখন লুকার প্রধান লক্ষ্য।
আর্জেন্টিনা, মেসি এবং জিদান পরিবারের রসায়ন
আলজেরিয়ার প্রথম প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা হওয়ায় এই ম্যাচের আবহ আরও জমজমাট। লুকার বাবা জিনেদিন জিদানের সঙ্গে আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসির সম্পর্কটা বরাবরের মতোই ভীষণ শ্রদ্ধার। কিছুদিন আগেই এক স্পন্সরশিপের অনুষ্ঠানে জিদান ও মেসিকে একসাথে খোশগল্পে মেতে উঠতে দেখা গিয়েছিল, যেখানে জিদান অকপটে স্বীকার করেছিলেন মেসির জাদুকরী ফুটবল শৈলীর কথা। মেসিও জিদানকে ফুটবলের অন্যতম সেরা আইকন হিসেবে সম্মান করেন।
এখন বাবার সেই প্রিয় প্রতিপক্ষের দেশের বিপক্ষেই লুকাকে লড়তে হবে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে। ‘ভিন গ্রহের খেলোয়াড়’ মেসির দুর্দান্ত আক্রমণ ঠেকাতে আলজেরিয়ার গোলপোস্টে যদি জিনেদিন জিদানের ছেলে দাঁড়ায়, তবে তা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এক অদ্ভুত সুন্দর সংযোগ তৈরি করবে।
শেষ বাঁশি বাজার অপেক্ষায়…
আলজেরিয়ার ক্রীড়াপ্রেমীদের চায়ের কাপে এখন ঝড়—লুকা কি পারবেন প্রথম ম্যাচে জালের নিচের অতন্দ্র প্রহরী হতে? যদি তিনি প্রথম একাদশে সুযোগ পান, তবে তা কেবল একটি ম্যাচ থাকবে না; তা হবে জিদান সাম্রাজ্যের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা, যেখানে এক ফরাসি কিংবদন্তির ছেলে আলজেরিয়ার পতাকা বুকে নিয়ে লড়বেন আর্জেন্টিনার রুদ্রমূর্তির সামনে।


