বাংলাদেশে ধর্ষণের চেষ্টা, চুরি ও নানা সামাজিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চলতি মে মাসে শুধু গণপিটুনিতেই প্রাণ হারিয়েছেন ৩২ জন।
দেশের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে নিজেদের মাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে দেশে অন্তত ৬৯টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩২ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ৭১ জন। অথচ এর আগের মাস এপ্রিলে এ ধরণের সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল ২১ এবং আহতের সংখ্যা ছিল ৪৯।
মে মাসে চুরির অভিযোগে ১৪ জন, সাধারণ বাকবিতণ্ডার জেরে ৪ জন, ডাকাতির অভিযোগে ২ জন এবং ধর্ষণচেষ্টা বা নিপীড়নের অভিযোগে ২ জনসহ জমিজমা ও পূর্বশত্রুতার জেরে বাকিদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইদানীং ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় অভিযুক্তদের ধরে মব সৃষ্টি করে গণপিটুনি দেওয়ার নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অপরাধ দমনে পুলিশ যখন বিশেষ অভিযানে যাচ্ছে, তখন তাদের ওপরও অন্তত ২৩টি মবের ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতাকে প্রকাশ করে।
এমএসএফ জানায়, সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতিও এই সময়ে বেশ নাজুক হয়ে উঠেছে। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে মে মাসে অন্তত ১৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর গুলি ও নির্যাতনে এবং সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় দুষ্কৃতকারীদের হামলায় মোট ৭ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। কসবা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে এক কলেজ শিক্ষার্থীসহ দুজন নিহত হওয়ার ঘটনায় ধস্তাধস্তিতে আরও ১৩ জন আহত হন।
অন্যদিকে, মিয়ানমার সীমান্তে স্থল মাইন বিস্ফোরণে ৩ জন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার পাশাপাশি একজনের অঙ্গহানির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া এ মাসে ১০ জন বাংলাদেশি নাগরিককে পুশ-ইন করার ঘটনাও ঘটেছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রে এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে হতাহতের সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেলেও মাঠপর্যায় এখনো উত্তপ্ত। মে মাসে সংঘটিত ৩৪টি রাজনৈতিক সংঘর্ষে ১৯৩ জন আহত এবং ৩ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন বিএনপি কর্মী, একজন জামায়াত কর্মী এবং একজন সাধারণ নারী রয়েছেন। দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বে ১৬টি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে এই অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া দুষ্কৃতকারীদের টার্গেটেড হামলা এবং ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে আরও বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকর্মীর প্রাণহানি ঘটেছে। পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সরকার পতন-সংবর্তী মামলাগুলোতে এই মাসে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের হার এপ্রিলের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের ক্ষেত্রে শারীরিক হামলার চেয়ে আইনি হয়রানি এবং প্রাতিষ্ঠানিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মে মাসে ১৩ জন সাংবাদিক আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন, যা গত মাসে ছিল ৮ জন। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলা, সাইবার সুরক্ষা আইন এবং মানহানির মামলা দেওয়ার প্রবণতা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে। যদিও সাইবার সুরক্ষা আইনের সার্বিক ব্যবহার সংখ্যাগত দিক থেকে কিছুটা কমেছে, তবুও এই আইনের অপপ্রয়োগের ঝুঁকি এখনো বহাল রয়েছে।
অন্যান্য সূচকের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনা এবং কারা হেফাজতে মৃত্যুর হার প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। মে মাসে নদী, সড়ক বা ফসলি জমি থেকে ৫৩টি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ৭ জন বন্দির। তবে ইতিবাচক দিক হিসেবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও জাতিগত নির্যাতনের ঘটনা এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে বেশ কমে এসেছে।
এমএসএফ তাদের সার্বিক মূল্যায়নে উল্লেখ করে, কিছু ক্ষেত্রে সংখ্যাগত উন্নতি সত্ত্বেও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি মূলত দুর্বল আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাবে একটি কাঠামোগত ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।


