‘আন্দোলন সশস্ত্র বিপ্লবও হতে পারতো’

‘আন্দোলন সশস্ত্র বিপ্লবও হতে পারতো’
‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’…অগ্নিগর্ভ জুলাই, গণঅভ্যুত্থানের কাল। ছবি: সাদিক আল আশফাক/টাইমস
Advertisement
Advertisement

‘সেদিন গণভবন ঘেরাও হবে, সেটা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। গণভবন ঘেরাও করার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। সেনাবাহিনী গুলি করতে পারে, এ জাতীয় সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজানো হয়। ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ মেডিক্যালের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে মেডিক্যাল টিমও করা হয়েছিল,’ চূড়ান্ত বিজয়ের শেষ দিনগুলোর কথা এভাবে স্মৃতিচারণায় বলেন জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক,  বর্তমান স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ শীর্ষক গ্রন্থে অভ্যুত্থানের দিনলিপি তুলে ধরেছেন সজিব ভূঁইয়া। গত মার্চে প্রথমা প্রকাশনের প্রকাশিত বইয়ে ‘লংমার্চ: পরশু নয়, আগামীকালই’ দ্বিতীয় পর্বে তিনি তুলে ধরেন উত্তাল দিনগুলোর কথা।

জুলাই অভ্যুত্থানের মহানায়ক আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া। ছবি: ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া

আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘৫ আগস্টে কত বড় লোকসমাগম হবে, সেটা নিয়ে সংশয় ছিল। আগের রাত থেকেই খবর আসছিল, ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে ট্রাকে করে মানুষদের পুলিশ ও সেনাবাহিনী ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দিচ্ছে। আশপাশের অঞ্চল থেকে যে সমন্বয়কেরা আসতে চাইছিলেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করতে বলি। ঢাকায় ঢোকার সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বাধায় এগোতে না পেরে ব্যারিকেড পার হওয়ার জন্য গাড়ি থেকে নেমে মানুষ বিভিন্ন জমির আইল দিয়ে ঘুরে এসে আবার সড়কে উঠছিল।’

‘৪ আগস্ট সারা রাতই মানুষের ঢাকায় ঢোকার বিষয়ে খোঁজ রাখছিলাম। সে রাতে বোধ করি দেশের বেশির ভাগ মানুষই উত্তেজনায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। কারণ, রাত ৩-৪টার দিকেও আমি যখন ফেসবুকে পোস্ট করছিলাম, তাতে মানুষের ব্যাপক সাড়া পড়ছিল। ঢাকার বাইরে থেকে যারা আসছেন, তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা এবং ওয়াই-ফাই ইন্টারনেট উন্মুক্ত করে দেওয়ার জন্য মানুষের কাছে আহ্বান জানানো হয়। সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই লিখছিলেন, তাদের এলাকা থেকে যারা আসছেন, তারা তাদের বাসায় থাকতে পারেন। ৫ আগস্টের কর্মসূচি ঘিরে সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের গার্মেন্টস শ্রমিকদের যুক্ত করতে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করি। এদিন আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকার শহীদ মিনারে সমাবেশ করার কথা বলেছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘৪ আগস্ট রাতে কিছু সংখ্যালঘুর বাড়িঘর ও মন্দিরের ওপর আক্রমণ হয়েছে। আমাদের কাছে খবর আসছিল, আওয়ামী লীগ এ জাতীয় হামলা করে আন্দোলনকে ভিন্ন একটা রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। মধ্যরাতেই আমরা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাই। রাতে মাহফুজ ভাই আর নাহিদ ভাইকে বলি, সরকার পতনের পরে কী হবে, এর একটা রূপরেখা দেওয়ার দরকার হবে। আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক পরিসরে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছিল যে উচ্ছৃঙ্খল জনতা এসব করছে। এরা শেখ হাসিনার পতন ঘটাতে এবং নৈরাজ্য করতে এসেছে। মাহফুজ ভাইকে আমি একট ঘোষণাপত্র দেওয়ার কথা বলি। মাহফুজ আলম বলছিলেন, এখন ঘোষণাপত্র না দিয়ে কিছু পয়েন্ট দেওয়া যেতে পারে। ঘোষণাপত্র হিসেবে দেওয়া যেতে পারে এমন কিছু পয়েন্ট তিনি আমাকে বললেন। পয়েন্টগুলো লিখে আমি মাহফুজ ভাইকে পাঠাই। মাহফুজ ভাই ও ভূঁইয়া মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান সেটা সম্পাদনা করে আমাকে ফেরত পাঠান। ভোর ৩টা-৪টার দিকে সেটা আমি ফেসবুকে পোস্ট করি। ওই পোস্ট ছিল এ রকম:’

‘০১. ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানের সফলতা সাপেক্ষে কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ গঠন হবে। জরুরি অবস্থা, সামরিক শাসন কিংবা এমন কোনো ব্যবস্থা, যা ফ্যাসিবাদকে সার্ভ করে, তা ছাত্র-জনতা মেনে নেবে না।

০২. ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানের নেতৃত্বই হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম অংশীদার। নতুন বাংলাদেশ গঠনে ছাত্র-জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নিশ্চিত করাই হবে তাদের মূল দায়িত্ব।

আরও পড়ুন

০৩. গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী সরকার ও এর সুবিধাভোগী ব্যতীত সুশীলসমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে। সবাইকে নিয়ে একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবে।

০৪. অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম দিনেই ১৬ বছরে অন্যায়ভাবে আটককৃত রাজবন্দীদের মুক্তির আদেশ দেওয়া হবে।

০৫. ফ্যাসিবাদের সময়ে সংঘটিত ছোট-বড় সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা হবে।

এটা ঘোষণাপত্র না হলেও ঘোষণাপত্রের মতো কিছু পয়েন্ট এতে ছিল।’

‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’…অগ্নিগর্ভ জুলাই, গণঅভ্যুত্থানের কাল। ছবি: অনিক রহমান/টাইমস

আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের পতনের পর আমাদের মাথায় ছিল একটি অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের ধারণা। সেটা জাতীয় সরকার হবে, নাকি বিপ্লবী সরকার, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকে। এখন অনেকে বিপ্লবী সরকারের কথা বললেও সে সময়ের বাস্তবতা-পরিস্থিতির মধ্যে এ বিষয়ে অনেকেই দ্বিধান্বিত ছিল। আমরা তো কোনো সশস্ত্র বিপ্লব করিনি। কোনো বিপ্লবী ঘোষণাপত্রের ভিত্তিতে মানুষ রাজপথে নামেনি। সেই বাস্তবতার নিরিখে বিপ্লবী সরকার করার সুযোগ ছিল কম। তবে একটি গ্রহণযোগ্য ও অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী সরকারের ভাবনা থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের ধারণার পক্ষে মতামত আসে। রাজনৈতিক দলের ৫০ শতাংশ এবং সুশীলসমাজ ও শিক্ষার্থীদের ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব মিলিয়ে সে রকম একটি সরকার গঠন পরিকল্পনার এ্যামিবাদী সরকার ও তাদের সুবিধাভোগীরা ছাড়া

সরকার গঠন নিয়ে এ ধরনের চিন্তাভাবনা করা হলেও আওয়ামী লীগের পতনের বিষয়ে তখনো আমরা নিশ্চিত ছিলাম না।’

‘আমাদের ধারণা ছিল, আন্দোলন আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলবে। এমনকি এই আন্দোলন যে সশস্ত্র বিপ্লবও হয়ে উঠতে পারে, এমন একটা ভাবনা নাহিদ ভাই আর আমার ছিল। বিএনসিসির সদস্য থাকাকালে আমি রাইফেল চালানো শিখেছিলাম। পরিস্থিতি সেদিকে গড়ালে থানা থেকে অস্ত্র লুট করে আনার জন্য আমরা সবাইকে আহ্বান জানানোর পরিকল্পনা করে রাখি। প্রশিক্ষণ না থাকলেও যুদ্ধে নামার ঘোষণা দেওয়ার জন্য আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। এ পর্যন্ত তো বলতে গেলে একধরনের যুদ্ধই চলে আসছে, শুধু আমরা আন্দোলনকারীরা নিরস্ত্র ছিলাম। নাহিদ ভাই একটা ভিডিও বার্তা প্রস্তুত করে রাখেন। ৫ আগস্ট সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে কয়েকবার সশস্ত্র বিপ্লবের আহ্বান জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট লিখেও কেটে ফেলি। নিজের কাছেই বিষয়টা নিয়ে সুনিশ্চিত হতে পারছিলাম না। কারণ, ওই দিনই এ রকম পোস্ট দেওয়ার পর সরকার একটা ক্র্যাকডাউন করে সফল হয়ে গেলে আমাদের নিশ্চিতভাবে দেশদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করবে। নানা কিছু মিলিয়ে এই পোস্ট আর দেওয়া হয়নি,’ জানান আসিফ মাহমুদ।

 

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad