দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধ উপায়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে ২৭৩ জন নারী-পুরুষকে বহনকারী একটি ট্রলার ডুবে গেছে। ডুবে যাওয়া ট্রলারের যাত্রীরা বাংলাদেশি ও কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা নাগরিক।
বাংলাদেশিদের সবাই কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে ৯ জন জীবিত উদ্ধার হলেও অপর ২৬৪ জনের খোঁজ মিলছে না। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রলারের বেশিরভাগ যাত্রীর সলিল সমাধি হয়েছে।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা সাব্বির আলম সুজন জানান, চট্টগ্রাম থেকে ইন্দোনেশিয়াগামী বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ এমটি মেঘনা প্রাইড গত ৯ এপ্রিল দুপুরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে গভীর সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় ৮ পুরুষ ও এক নারীকে ভাসতে দেখে উদ্ধার করে। তারা বাংলাদেশি জানার পর তাদেরকে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের টহল জাহাজ মনসুর আলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কোস্ট গার্ড তাদের টেকনাফ থানায় নিয়ে আসে।
টেকনাফ থানা পুলিশ ও কোস্ট গার্ড বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনায় ৬ জন দালালকে আসামি করে টেকনাফ থানায় মামলা করেছে কোস্ট গার্ড। উদ্ধার হওয়া ৯ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া ৯ জন হলেন কক্সবাজার শহরতলীর শান্তি পাড়ার মো. হামিদ, মো. সায়াদ আলম ও মো. আকবর, টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকার মো. সোহান উদ্দিন, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মো. হৃদয়, উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের মো. রফিকুল ইসলাম, রাহেলা বেগম, মো. ইমরান ও টেকনাফ বড়বিল এলাকার মো. তোফায়েল আহমেদ।
ট্রলারডুবিতে বেঁচে ফেরা রাহেলা বেগম জানান, তার এক খালাতো ভাই তাকে মালয়েশিয়ায় বিয়ে দেয়ার কথা বলে সাগরপথে নিয়ে যাচ্ছিল। পথে ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলারটি আন্দামান সাগরে ডুবে যায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা ৯ জন সাগরে ভাসমান অবস্থায় ছিলাম। পরে একটি ট্রলারের সহায়তায় উদ্ধার হয়েছি।’ তবে বাকি যাত্রীদের কতজন উদ্ধার হয়েছে তা তিনি জানেন না। তিনি নিজের চোখে দেখেছেন- ১০-২০ জন নারীসহ অনেকেই সাগরে ডুবে গেছে।
এদিকে ট্রলারডুবিতে নিখোঁজদের স্বজনদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। প্রিয়জনদের কোনো খোঁজ না পেয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা তথ্য দেখে তারা প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন।
টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যংয়ের নিখোঁজ এনায়েতুর রহমানের বাবা মোহাম্মদ কালু জানান, তার ছেলে বাড়ির পাশের একটি ইটভাটায় দিনমজুর হিসেবে কাজ করতো। তার আয়ে ভালোভাবেই সংসার চলছিল। কিন্তু গত ২ এপ্রিল থেকে সে নিখোঁজ হয়।
কালু বলেন, খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছেন দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে তার ছেলে টেকনাফ হয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। একপর্যায়ে খবর আসে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে তাদের বহনকারী ট্রলারটি ডুবে যায়। ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে উদ্ধার হয়ে ফিরে আসাদের কাছ থেকেই তিনি পুরো ঘটনা জানতে পেরেছেন।
জিয়াউর রহমান নামের একজন জানান, তার দুই ছেলে মোহাম্মদ জুনায়েদ ও মোহাম্মদ তারেক ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হয়েছেন। তারা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে তিনি জানেন না।
এদিকে উদ্ধার হওয়া ও নিখোঁজ স্বজনরা বলছেন, দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে দালালরা নিষ্টুর মানব পাচার চালিয়ে গেলেও প্রশাসন নিরব থাকায় বেপরয়োরা হয়ে উঠেছে তারা। ফলে প্রতিনিয়িত অপহরণ-জিম্মি হয়ে অনেকে মানব পাচারের শিকার হচ্ছে। আবার অনেকে স্বেচ্ছায় সাগরপথে উন্নত জীবনের আশায় সাগরপথ পাড়ি দিচ্ছে।
সর্বশেষ এই ট্রলারডুবির ঘটনায় দালাল টেকনাফের শাকের মাঝি, হায়দার আলী, আব্দুল আমিন, সৈয়দ উল্লাহ, মো ইব্ররাহীম, আজিজুল হক, মাহমুদুল হক, শফিক, মোহাম্মদ উল্লাহ, মোজাহের মিয়া ওরফে গোরামিয়া, সায়াদ আলমসহ অনেকের নাম প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছে।
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে ট্রলারডুবির ঘটনায় কোস্ট গার্ডের হাতে উদ্ধার হওয়া উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, কাজের প্রলোভনে টেকনাফে এনে তাদেরকে একটি বোটে তোলা হয়। আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে যাত্রার পর আন্দামানের কাছে বোটটি ডুবে যায়।
তিনি বলেন, ‘আমি ও কয়েকজন দুইদিন সাগরে ভাসার পর উদ্ধার হই। ট্রলারটিতে প্রায় ২৮০ জন যাত্রী ছিল, যার মধ্যে নারী-শিশুও ছিল। বাকিদের কী হয়েছে জানি না।’
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের শাহপরীর দ্বীপের ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে যাত্রীবাহী ট্রলারডুবির ঘটনায় ৯ জন উদ্ধার হওয়ার পর থেকেই এলাকায় নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে মানুষের ছোটাছুটি বেড়েছে। অনেক পরিবার তার কাছে এসে তাদের প্রিয়জনদের সন্ধান চাইছেন।
তিনি বলেন, শাহপরীর দ্বীপ থেকেই অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাদের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ৯ জনকে কোস্ট গার্ড থানায় আসে। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।


