আগাম ঘোষণা দিয়ে হামলা: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা

আগাম ঘোষণা দিয়ে হামলা: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা
ডেইলি স্টার ভবনের বাইরের অংশ। ছবি: শামীম উস সালেহীন/টাইমস
Advertisement
Advertisement

ঢাকার সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্রগুলো এখন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকা। তবে এই ব্যবস্থা রাষ্ট্রের দূরদর্শিতার কারণে নয়, বরং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পর নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো, ফার্মগেটে ডেইলি স্টার এবং ধানমন্ডিতে ছায়ানট ভবনে পরিকল্পিতভাবে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন লাগানো হয়।

পরদিন শুক্রবার পল্টনে উদীচীর কার্যালয়েও আগুন দেওয়া হয়। এসব হামলা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং আগে থেকেই ফেসবুকে এসবের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও গোয়েন্দা সংস্থার কোনো আগাম সতর্কতা ছিল না। এই হামলা প্রতিরোধের জন্য পর্যাপ্ত পুলিশও মোতায়েন করা হয়নি।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হাদি মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হলেও সুযোগসন্ধানী কিছু গোষ্ঠী দ্রুত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ধ্বংসলীলার ব্যাপকতার চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো এসব ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে। যেখানে সার্বক্ষণিক পুলিশি টহল থাকে এবং কাছেই থানা অবস্থিত, সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই তান্ডব থামাতে পুলিশের তৎপরতা চোখে পড়েনি।

প্রথম আলোর পুড়ে যাওয়া ভবন। ছবি: শামীম-উস-সালেহীন/ টাইমস

হামলাকারীরা শাহবাগ থেকে মিছিল নিয়ে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনে গিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এরপর তারা প্রকাশ্যে পরবর্তী গন্তব্য ঘোষণা করে ডেইলি স্টার অফিসের দিকে রওনা হয়। যৌথ বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেই সেখানে আগুন দেওয়া হয়।

রাত ১২টার দিকে যখন ফায়ার সার্ভিস মই দিয়ে ভবনটির ছাদ থেকে সাংবাদিকদের উদ্ধার করছিল, তখনও হামলাকারীরা ভেতরে ঢোকার চেষ্টা চালায়। পুলিশ সূত্র স্বীকার করে, হামলা হওয়ার ভয় এবং জনবল সংকটের কারণে সেদিন তারা কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নূরুল হুদা এই ঘটনাগুলোকে পরিকল্পিত হামলা হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এখানে পুলিশের অবহেলা ছিল স্পষ্ট। আগাম ঘোষণার পরও ব্যবস্থা না নেওয়াকে তিনি পুলিশের শিথিলতা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডোর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী সরাসরি পুলিশের নেতৃত্বের ব্যর্থতাকে দায়ী করেন।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে অপরাধীদেরকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা অপরাধীদের দুঃসাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। ছায়ানটের মতো অরাজনৈতিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা দেশের স্বাধীনতার প্রতীকগুলোর ওপর বড় আঘাত।

আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে এ ধরনের ঘটনার বিচার না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন ইশফাক ইলাহী চৌধুরী।

অভিযোগ উঠেছে, এই ঘটনার দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার।

ছায়ানটের নান্দনিক ভবনটি জুড়ে এখন শুধুই ক্ষতচিহ্ন। ছবি: মো. রিজওয়ানুল হাসান/টাইমস

উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফায়জুল কবির খানের দাবি, ইনকিলাব মঞ্চের কেউ এই হামলায় জড়িত নয়। ঘটনার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি। উপদেষ্টা স্বীকার করেন, হামলার বিষয়ে আগে থেকে কোনো গোয়েন্দা তথ্য ছিল না।

অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঘটনাগুলো হঠাৎ ঘটেছে। রাস্তা অবরোধ থাকায় মিরপুর বা রাজারবাগ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ আসতে দেরি হয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, যেখানে আগে থেকেই হামলার ঘোষণা ছিল, সেখানে পুলিশের এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

গত ১২ নভেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন বিজয়নগরে গুলিবিদ্ধ হন হাদি। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হলে সেখানে বৃহস্পতিবার রাতে তিনি মারা যান। এই মৃত্যুর খবর আসার পরপরই গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা শুরু হয়।

এসব প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। ছায়ানটে হামলার ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় মামলা হলেও প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনায় শনিবার রাত পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। এই দুই প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ বলছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের পর মামলা করা হবে।

উদীচীর পক্ষ থেকেও শাহবাগ থানায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলাকারীদের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা হুমকির আশঙ্কা বুঝতে পেরে আগেই সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু নিরাপত্তা পৌঁছানোর আগেই হামলা শুরু হয়ে যায়। ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষও তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে সরকারের শিথিল মনোভাবের সমালোচনা করেছে।

ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা জানান, তারা আগে থেকেই নিরাপত্তা চেয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশ আসার আগেই হামলাকারীরা তাণ্ডব চালিয়ে চলে যায়।

উদীচীর পক্ষ থেকেও তোপখানা রোডের কার্যালয়ে নিরাপত্তার জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু শাহবাগ থানা থেকে কোনো সাড়া মেলেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

সব মিলিয়ে রাজধানীর বুকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে এমন ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় ধরনের ব্যর্থতাকেই তুলে ধরছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad