পরীক্ষার প্রস্তুতি আছে, উত্তর লিখবেন কে

শ্রুতিলেখকের অভাব, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার ঘাটতি, অনিশ্চিত জীবনের শঙ্কায় দৃষ্টিহীন ও শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সীমাহীন দুর্ভোগ

পরীক্ষার প্রস্তুতি আছে, উত্তর লিখবেন কে
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশের পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাহুল। চোখে কালো চশমা, হাতে সাদা ছড়ি। সামনেই তার সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। কিন্তু পরীক্ষার প্রস্তুতির চেয়েও বড় একটি দুশ্চিন্তা তাকে তাড়া করছে। পরীক্ষার হলে তার হয়ে উত্তর লিখবেন কে? এত দিনের পড়াশোনা আর পরিশ্রমের ফল শেষ পর্যন্ত কার হাতে নির্ভর করবে?

কেবল রাহুলই নন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে পড়ুয়া শারীরিক প্রতিবন্ধী, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের অনেকের কাছেই পরীক্ষা মানে কেবল মেধা যাচাই নয়। বরং প্রতিবার পরীক্ষার আগে তাদের নতুন করে একজন ‘শ্রুতিলেখক’ খুঁজতে হয়। ওই ‘শ্রুতিলেখক পরীক্ষার্থীদের মুখে বলা উত্তর পরীক্ষার খাতায় লিপিবদ্ধ করেন।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নিজেদেরই ‘শ্রুতিলেখক জোগাড় করতে হয়। কখনো তাদের বন্ধুদের সাহায্য নিতে হয়, কখনো নির্ভর করতে হয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ওপর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের নিজেদেরই ‘শ্রুতিলেখক খুঁজে নিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শুধু তাদের অনুমোদন দেয়। কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে উঠেছে। মাঝেমধ্যে সেগুলোর সহায়তা পাই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা করেনি।’

শুধু পরীক্ষার হলে উত্তর লেখা নয়, নিয়মিত পড়াশোনার ক্ষেত্রেও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের। বিভাগ থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া পাঠ্যবই কিংবা সহায়ক বই দৃষ্টিশক্তি না থাকায় তারা সরাসরি পড়তে পারেন না।

ওই শিক্ষার্থী জানান, কোনো বইয়ের পিডিএফ সংস্করণ অনলাইনে পাওয়া গেলে সেটিকে ‘শ্রবণযোগ্য বইয়ে’ রূপান্তর করে তারা পড়াশোনা করেন তারা। তা না হলে বই কিনে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাছে দিতে হয়। সংগঠনের কর্মীরা সেই বই পড়ে রেকর্ড করে তাদের জন্য ‘শ্রবণযোগ্য সংস্করণ’ তৈরি করে দেন।

অনেক সময় অন্যের সাহায্যে নিয়েই পিডিএফ ফাইলটিকে মোবাইল অ্যাপ ক্যামস্ক্যানারের মাধ্যমে পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি পাতার ছবি তুলতে হয়। এরপর সেগুলো পিডিএফ নথিতে রূপান্তর করে বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে শুনে পড়তে হয়।

এসব প্রক্রিয়ায় ব্যয় হয় দীর্ঘ সময়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষাক্রমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক হিসেবে কাউকে সঙ্গে রাখতে হলে নিজের চেয়ে নিচের শিক্ষাবর্ষের কোনো ব্যক্তির সহায়তা নিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) আবদুস সালাম বলেন, ‘দ্বিতীয় বর্ষের কোনো শিক্ষার্থী প্রথম বর্ষের একজনকে শ্রুতিলেখক হিসেবে নিতে পারেন। একইভাবে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অধ্যয়নরত কাউকে শ্রুতিলেখক হিসেবে নিতে পারেন।’

আরও পড়ুন

তবে এ জন্য আগে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমোদন নিতে হয়। শ্রুতিলেখকের ছবি এবং পরীক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় সব তথ্য জমা দিয়ে অনুমতির আবেদন করতে হয়।

আবদুস সালাম বলেন, ‘আমরা কোনো শিক্ষার্থীকে আলাদা চোখে দেখি না, দেখাও উচিত নয়। তা হলে তারা নিজেদের বৈষম্যের শিকার মনে করবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মধ্যে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের মতো কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

সংগঠনটি জানিয়েছে, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য তাদের একটি স্বেচ্ছাসেবক দল রয়েছে। পরীক্ষার বিস্তারিত তথ্য আগে থেকে জানালে শিক্ষার্থীদের অনুরোধ অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবকেরা সহায়তা করার চেষ্টা করেন।

তবে এ ব্যবস্থাতেও নানা সমস্যা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির একজন প্রতিনিধি।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক বিভাগে একই সময়ে পরীক্ষা শুরু হলে অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক পাওয়া যায় না। আবার আগে থেকে নিশ্চিত করা কোনো শ্রুতিলেখক শেষ মুহূর্তে উপস্থিত না হলে বিকল্প কাউকে খুঁজে বের করা এবং এত অল্প সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের এসব সমস্যার পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণের সংকটকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হোসেন টাইমসকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুবিধাবঞ্চিত কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য যে অবকাঠামো রয়েছে, তা যথাযথভাবে প্রস্তুত নয়। শিক্ষা উপকরণেরও সংকট রয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে আসাও এসব শিক্ষার্থীর জন্য বড় বাধা।’

ফরহাদ হোসেনের মতে, রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং জাতীয় পর্যায়ে নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ ছাড়া এসব সমস্যার সমাধান কঠিন।

তিনি বলেন, ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা, তাদের সমতা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আমরা রাষ্ট্র হিসেবে এখনো প্রস্তুত নই।’

সমস্যা সমাধানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছোট পরিসরে বিশেষ শিক্ষা উপকরণকেন্দ্র গড়ে তোলার পরামর্শ দেন ফরহাদ হোসেন। এসব কেন্দ্র থেকে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ করতে পারবেন। অবশ্য এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের আগে আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ও ভবনগুলো প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের চলাচল ও ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে সম্প্রতি বিশ্ব সাদা ছড়ি নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও বিভিন্ন বিভাগে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী পাঠকক্ষ, উন্নত পাঠসহায়ক প্রযুক্তি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা হবে।

পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ফুটপাত ও হাঁটার পথ প্রতিবন্ধীবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান উপাচার্য। তিনি আশ্বস্ত করেন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন ও অধিকার সম্পর্কে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad