আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) বিচারের মন্থর গতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা মহলের সমালোচনা ও তীর্যক মন্তব্য থাকলেও ধীরে ধীরে কাজের ফলাফল দৃশ্যমান হচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন সহযোগীর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিষ্পত্তি হয়েছে গত বছর। সবকিছু ঠিক থাকলে, বিচার কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে এগোলে; চলতি বছরে কম-বেশি ১৫ মামলার বিচার শেষ হতে পারে।
সিনিয়র প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, আদালতে কয়েকটি মামলা অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে আছে। এ বছর কিছু মামলার নিষ্পত্তি হতে পারে; তবে সংখ্যা সঠিকভাবে বলা যায় না। আগামী মাসের মধ্যে আরও সাত/আটটি মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা যাবে বলে তিনি মনে করেন।
সূত্র মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন একটি বিশেষ আইন। আইনের স্পিরিট অনুযায়ী এখানে অপরাধের গুরুত্ব ও ভয়াবহতার কারণে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে হবে। অভিযোগ গঠন পর্যায়ে থাকা বা অভিযোগ গঠনের পরে মামলার বিচার শেষ হতে আইন অনুযায়ী বেশি সময় লাগার কথা নয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে যুক্তিতর্ক।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার চানখারপুলে ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে গুলি চালায় পুলিশ। এতে শাহরিয়ার খান আনাসসহ ছয়জন নিহত হন। সেই ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত বছরের ২০ এপ্রিল চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সংস্থা। এটি ছিল জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন। আগামী ২০ জানুয়ারি এ মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য রয়েছে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আটজনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। এর আগে গত বছরের ১ ডিসেম্বর এই মামলায় প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ওই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর, সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে প্রসিকিউশন। সেদিনই শুনানি শেষে ইনুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় আদালত। ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণে ২০ জন সাক্ষীর তালিকা দিয়েছে প্রসিকিউশন। এ ছাড়া নথি হিসেবে তিনটি অডিও ও ছয়টি ভিডিও দেওয়া হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গত বছর হাসিনাসহ তিন সহযোগীর সাজা হয়েছে। হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড হলেও, রাজসাক্ষী হয়ে বিচারে সহযোগিতা করায় অপর আসামি আবদুল্লাহ আল মামুনের পাঁচ বছরের লঘুদণ্ড হয়েছে। এক অভিযোগে হাসিনা ও কামালের সাজা বাড়াতে আপিল করেছে প্রসিকিউশন। সাজা থেকে খালাস চেয়ে মামুন আপিল করেছেন; যার নিষ্পত্তিও এ বছর হতে পারে। হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আরও তিনটি মামলা রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের ঘটনায় হাসিনা ছাড়াও বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের বিচার চলছে। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই পরিচালিত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়েছে।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর এ মামলায় পতিত প্রধানমন্ত্রী হাসিনা; বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠন করে আদালত। ১৯ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের উদ্বোধনী বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে। গ্রেপ্তার তিন আসামি নিজেকে অভিযোগ গঠনের আদেশের প্রাক্কালে নির্দোষ দাবি করেন। বাকিরা পলাতক।
পরে ২২ ডিসেম্বর গুমের আরেক মামলার বিচার শুরু হয়। র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুমের ঘটনায় হাসিনা ছাড়াও বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ গঠনের জবাবে কাঠগড়ায় উপস্থিত আসামিরা নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। ২১ জানুয়ারি এ মামলায় প্রসিকিউশনের উদ্বোধনী বক্তব্যের দিন ধার্য রয়েছে। টিএফআই সেলে গুমের ঘটনায় ১৭ আসামির মধ্যে ১০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন, তারা সেনা কর্মকর্তা। বাকিরা পলাতক।
গণঅভ্যুত্থানের সময় রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চার আসামির বিরুদ্ধে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর ছয়টি অভিযোগ গঠন করা হয়।
এসব মামলায় আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী মাসুদ সালাউদ্দিন। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘এসব মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণে বেশ সময় লাগবে। সব মিলিয়ে আইনসংগতভাবে সময়ে মামলা নিষ্পত্তি হবে। আমরা আশা করি, প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হবে না, আসামিরা খালাস পাবেন।’
আসামিপক্ষের অন্য একজন আইনজীবী বলেন, ‘অপরাধের গুরুত্বের কারণে আইনে মামলাগুলো দ্রুত গতিতে নিষ্পত্তির নির্দেশনা রয়েছে। প্রসিকিউশন চাইবে, দ্রুত নিষ্পত্তি হোক। এতে আমাদের তো কিছু করণীয় নেই।’
পতিত আওয়ামী লীগের শাসনামলে সরকারের মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতায় শতাধিক গুম এবং হত্যার ঘটনায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ হয়েছে। অপরাধের গুরুত্ব ও ভয়াবহতা বিবেচনায় ন্যায়বিচারের স্বার্থে জিয়াকে প্রসিকিউশন একমাত্র আসামি করেছে। এ মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে ১৪ জানুয়ারি আদেশ দেওয়া হবে।
এর আগে, গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর জিয়ার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় আদালত। প্রসিকিউশনের মতে, ২০০৯-২০১৬ সময়কালে জিয়া র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক এবং এডিজি (অপারেশনস) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ সময়ে বলপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন, অগণিত হত্যাকাণ্ড, গুমসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধে তার সরাসরি নির্দেশ, অনুমোদনক্রমে, জ্ঞাতসারে তার বিশস্ত র্যাব সদস্যরা সংঘটন করতেন।
২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের হত্যা-নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তদন্ত চলছে। এই মামলায় হাসিনাসহ আসামি ২১ জন, এর মধ্যে চারজন গ্রেপ্তার। ১২ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের কথা রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানে প্রথম শহীদ রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি শেষ পর্যায়ে এসেছে। এ মামলায় বেরোবির সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশীদসহ ৩০ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ছয়জন। গত বছরের ২৭ আগস্ট প্রসিকিউশন সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে। এর আগে ৬ আগস্ট এ মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়।
এ মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী, ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ আমিনুল গনি টিটু টাইমসকে বলেন, ‘মামলাটি দ্রুত শেষ হওয়া উচিত। আমার হিসাব মতে, এ মাসে না হলেও আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে যুক্তিতর্ক হতে পারে। তবে, প্রসিকিউশন কবে করবে, সেটা তাদের ব্যাপার।’
এ মামলায় আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী সালাউদ্দিন রিগ্যান টাইমসকে বলেন, ‘সর্বশেষ অবস্থা পর্যালোচনা করে বলা যায়, অল্প কিছু দিনের মধ্যেই মামলাটির বিচার শেষ হবে।’
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে ১১ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনের শুনানি হবে। ১৪ জানুয়ারি আসামিপক্ষ অভিযোগ গঠনের প্রশ্নে শুনানি করবে। এর আগে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর জয় ও পলকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। তাদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
পলকের আইনজীবী লিটন আহমেদ টাইমসকে বলেন, ‘যৌক্তিক সময়ের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তি হবে। অভিযোগ গঠন কিংবা ট্রায়াল পর্যায়ে থাকা মামলাগুলো নিষ্পত্তি হতে ন্যায়বিচারের স্বার্থে যুক্তিসংগত সময় প্রয়োজন।’
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযোগ গঠন করা হবে কি না, সে বিষয়ে ১২ জানুয়ারি আদেশ দেওয়া হবে। এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে। ৪ ডিসেম্বর সালমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ১৩ আগস্ট সালমান ও আনিসুলকে আটক করা হয়। পরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ ছাড়া, বর্তমানে দৃশ্যপটের বাইরে থাকা কোনো কোনো মামলারও কার্যক্রম এগিয়ে গিয়ে এ বছর বিচার শেষ হতে পারে।


