আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচি ঘিরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিতে স্পষ্ট পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। ডলারের বিনিময় হার, জ্বালানির দাম, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাতের নীতিতে একের পর এক সমন্বয় এখন আইএমএফের শর্ত পূরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণের কিস্তি ছাড় ও নতুন বাজেট সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার এখন নীতিগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। এমনকি কিছু জায়গায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ঘোষিত কিছু অগ্রাধিকার প্রকল্প থেকেও সরে আসার ইঙ্গিত মিলছে।
আইএমএফ থেকে চলমান ঋণ প্যাকেজের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ও বাজেট সহায়তা হিসেবে আরও ২ বিলিয়ন ডলার আগামী জুনের মধ্যে নিশ্চিত করতে চায় সরকার।
ঋণ পেতে সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশ দেখা গেছে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ে। ভর্তুকির চাপ কমাতে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিন – সব ধরনের জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে রোববার থেকে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু বাজার সমন্বয় নয়, বরং ভর্তুকি কমিয়ে আইএমএফের শর্ত পূরণের অংশ।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বাড়লেও ‘জনভোগান্তি বিবেচনায়’ সরকার ভর্তুকি বাড়িয়ে দাম স্থির রেখেছিল। তবে ইরান যুদ্ধ শুরুর ৫১ দিনের মাথায় নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসে জ্বালানির দাম বাড়ালো সরকার।
জীবনযাত্রা ব্যয় বেড়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তবে অর্থনীতিবিদরা এটাও বলেছেন, স্বল্প মেয়াদে ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানির দাম ঠিক রাখলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ টাইমসকে বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ানো সহজ সিদ্ধান্ত নয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি অনেকটাই ‘অপরিহার্য’। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় দাম সমন্বয় না করলে ভর্তুকির চাপ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ত, যা সরকারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর প্রভাব দ্রুত পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্যের দামে পড়বে, ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। ‘নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়বে,’ বলেন তিনি। এই অর্থনীতিবিদের মতে, এই চাপ মোকাবিলায় সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো জরুরি।
এদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পদক্ষেপের আগেই বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সক্রিয় হতে দেখা গেছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। দেড় মাস বিরতির পর টানা দুইদিন বাজার থেকে ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ১২২ দশমিক ৭৫ টাকা কাট-অফ রেটে মোট ১২ কোটি ডলার কেনার মাধ্যমে একদিকে রিজার্ভ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে বাজারে ডলারের একটি কার্যকর দরের সংকেত দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এমন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে বলেন, ‘এই রেটের মাধ্যমে মূলত বাজারকে একটি দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে আন্তঃব্যাংক লেনদেন ওই সীমার কাছাকাছি থাকে।’
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ডলার কেনার এই পদক্ষেপটি বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা–জোগানের ফল নয়, বরং সরাসরি আইএমএফের শর্ত পূরণের অংশ। সংস্থাটি বাংলাদেশকে নিট আন্তর্জাতিক রিজার্ভ (এনআইআর) ২০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রাখতে বলেছে। কিন্তু জ্বালানি ও সারের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া, রেকর্ড বাণিজ্য ঘাটতি এবং পূর্বের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে এই সূচক ওই সীমার নিচে নেমে যায়।
ওয়াশিংটনে আইএমএফের সঙ্গে বৈঠকের সময় বিষয়টি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সামনে তুলে ধরা হয়। সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকের মধ্যেই গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ঢাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকে ফোন করে নির্দেশ দেন বাজার থেকে ডলার কিনে এনআইআর পুনরুদ্ধার করতে এবং একই সঙ্গে বিনিময় হারকে নির্ধারিত করিডোরের মধ্যে রাখতে হস্তক্ষেপ করতে। এর পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কেনা শুরু করে।
একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হারকে একটি নির্দিষ্ট করিডোরের মধ্যে রাখার শর্ত আছে এই আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাটির। এই করিডোরের বাইরে গেলে বাজারে হস্তক্ষেপ করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। ১২২.৭৫ টাকার কাট-অফ রেটে ডলার কেনার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত বাজারে একটি ‘সিগন্যাল রেট’ স্থির করেছে, যার আশপাশেই এখন আন্তঃব্যাংক লেনদেন হওয়ার কথা।
চলমান প্রেক্ষাপটে সরকার শুধু জ্বালানির দামই বাড়াচ্ছে না, বরং কোয়াজি-ফিসক্যাল কার্যক্রম বা পরোক্ষ সরকারি আর্থিক ব্যয়ও ধীরে ধীরে সংকুচিত করার পথে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের কোয়াজি-ফিসক্যাল কার্যক্রম সীমিত করার ওপর জোর দিচ্ছে।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে (সিএমএসএমই) বড় পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করার পরিকল্পনা থাকলেও সেই উচ্চাভিলাসেও লাগাম টানতে যাচ্ছে সরকার।
একই কারণে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা থেকে কার্যত সরে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যদিও ব্যবসায়ী মহল থেকে এ দাবি জোরালো ছিল। একইভাবে বিভিন্ন খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম বড় করার উদ্যোগও সীমিত রাখা হচ্ছে, যাতে সরকারের ব্যালান্স শিটে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
এছাড়া সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি– যেমন পরিবার কার্ড, কৃষি সহায়তা বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা– এসব ক্ষেত্রেও এক ধাক্কায় সম্প্রসারণ না করে ধাপে ধাপে এগোনোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রেখে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে এগোনোর এই কৌশল মূলত আইএমএফকে দেখানোর জন্য যে সরকার নীতিগতভাবে ‘কঠোর সমন্বয়’-এর পথে হাঁটছে।
আইএমএফের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এমন কর্মকর্তারা টাইমসকে বলছেন, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য আইএমএফ মিশন আসার আগেই একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া—বাংলাদেশ শর্ত পূরণে অগ্রসর হচ্ছে।
‘আইএমএফকে বোঝাতে হবে আমরা সিরিয়াস। শুধু আলোচনা নয়, বাস্তব পদক্ষেপও দেখাতে হবে,’ বলেন এক কর্মকর্তা।
জ্বালানি আমদানিতে চাপ বাড়ছে
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের পেছনে আমদানি ব্যয়ের বাড়তি চাপ বড় ভূমিকা রেখেছে। বছরের শুরু থেকে এলএনজি আমদানি জানুয়ারির প্রায় ৪ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টন থেকে ফেব্রুয়ারিতে ৫ লাখ ১৭ হাজার এবং মার্চে ৫ লাখ ৪৬ হাজার টনের বেশি হয়েছে; একই সময়ে এর আমদানি ব্যয় ২২২ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে মার্চে প্রায় ২৫৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
একই সময়ে পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানিতে মার্চে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারিতে যেখানে প্রায় ৪৪ হাজার টন আমদানি হয়েছিল, মার্চে তা লাফিয়ে ২ লাখ ১৪ হাজার টনের বেশি হয়; ব্যয়ও প্রায় ২১ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১১৬ মিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠে যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ ঝুঁকি ও দামের আরও বৃদ্ধির আশঙ্কায় আগাম বড় পরিসরে ক্রয় করা হয়েছে। ডিজেলের ক্ষেত্রেও ফেব্রুয়ারিতে তীব্র পতনের পর মার্চে বড় আকারে আমদানি বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে। জানুয়ারিতে প্রায় ৪ লাখ ৫৬ হাজার টন আমদানির পর ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে মাত্র ৭৫ হাজার টনে, তবে মার্চে আবার তা বেড়ে ৪ লাখ ৪১৬ হাজার টনের বেশি হয়।
নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো বলছে, এই তিনটি পণ্যের সম্মিলিত চিত্রই দেখাচ্ছে যে জ্বালানি আমদানি এখন অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও অস্থির হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক দামের ওঠানামার কারণে আমদানি বিল দ্রুত বাড়ছে, যা সরাসরি ভর্তুকির ওপর চাপ তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। বহিঃখাতের চাপ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে গিয়ে সরকারকে অভ্যন্তরীণ নীতিতে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই নীতিগত পরিবর্তনের গতি ও কার্যকারিতার ওপরই নির্ভর করবে আইএমএফের ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় এবং নতুন অর্থায়নের ভবিষ্যৎ।


