আইএমএফে’র চাপে বাজেট প্রণয়নের গতি মন্থর

আইএমএফে’র চাপে বাজেট প্রণয়নের গতি মন্থর
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেওয়া শর্ত পূরণের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চাপের মুখে পড়েছে সরকার। এ কারণে মন্থর হয়ে পড়েছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নের কাজের গতি।

বাজেটটি আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে পেশ করার কথা রয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা বলছেন, নীতিগত এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সমন্বয়ে বাজেট কাজের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কাজের গতি কমে যাওয়ার পেছনে তারা চারটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলো— আইএমএফ কর্মসূচির আওতায় প্রয়োজনীয় সংস্কার, বৈদেশিক ঋণের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা, বিনিয়োগ মন্দার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সুস্পষ্ট নীতি নির্দেশনার অভাব।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা সংস্কার বাস্তবায়নেও সরকার এখন ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে রয়েছে।

আইএমএফ-এর শর্ত পূরণে বিলম্বের ফলে ইতিমধ্যে ঋণ ছাড়ের গতিও প্রভাবিত হয়েছে। এমন এক সময়ে এই অনিশ্চয়তা তৈরি হলো যখন দেশের ওপর আর্থিক চাপ এমনিতেই অনেক বেশি।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলমান ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি সরকার আইএমএফ-এর কাছে আরও ২ বিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বব্যাংকের কাছে ১ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক আর্থিক চাপ সামাল দিতে জরুরি সহায়তা হিসেবে এই তহবিল চাওয়া হচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা।

২০২২ সালে একগুচ্ছ সংস্কার শর্তে রাজি হওয়ার পর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ আইএমএফ-এর এই ঋণ কর্মসূচিতে প্রবেশ করে।

সরকার এখন আইএমএফ কর্মসূচিতে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে চাইছে না। কারণ, এতে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের আর্থিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে, বাধাগ্রস্ত হতে পারে বিদেশি ঋণ ও ক্রেডিট লাইন পাওয়ার পথ।

আরও পড়ুন

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, রাজস্ব নীতি হতে হবে প্রবৃদ্ধিবান্ধব, পূর্বাভাসযোগ্য এবং বিনিয়োগের জন্য সহায়ক।

‘কর নীতিতে স্থিতিশীলতা না থাকলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না,’ উল্লেখ করে তিনি নতুন কর আরোপের চেয়ে বাণিজ্য সহজীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেন।

আইএমএফ-এর শর্ত অনুযায়ী কর ছাড় প্রত্যাহার করা হবে নাকি নতুন প্রণোদনা দেওয়া হবে—তা নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি। দাতা সংস্থাটি আগামী অর্থবছরের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ দশমিক ২ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছে।

এর ফলে সরকার এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে পারেনি, যা বাজেট প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার পেছনে ভূমিকা রাখছে।

তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিক অনিশ্চয়তাগুলো এখন কেটে গেছে। বাজেট প্রস্তুতি আবার গতি ফিরে পেয়েছে।

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে জনকল্যাণকে গুরুত্ব দিয়েই এখন বাজেট সাজানো হচ্ছে বলে তারা জানান।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বাজেট প্রণয়নে সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের সুপারিশকে প্রাধান্য দিচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থই অগ্রাধিকার পাবে।’ শিল্পায়ন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কার্যকর নীতি গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।

আগামী অর্থবছরে এনবিআর’কে ছয় লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হতে পারে, যার জন্য কর আদায়ে প্রায় ৪২ শতাংশের মতো উচ্চ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।

বাজেট প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এনবিআর অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শেষ করলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ১০-১১ মে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এবং ১৪ মে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের আগে প্রস্তাবনাগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এই আলোচনার পরই বাজেটের আনুষ্ঠানিক কাজ পুরোদমে শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে আইএমএফ-এর চাপে এনবিআর পুনর্গঠনের উদ্যোগ পুনরায় শুরু করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জাবিউল্লাহর নেতৃত্বে এনবিআর’কে দুই ভাগে বিভক্ত করার পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সম্প্রতি এক প্রজ্ঞাপনে রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনগুলো পর্যালোচনা করে সেগুলোকে আরও কার্যকর ও বাস্তবসম্মত আইনি কাঠামোতে রূপান্তর করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এর আগে রাজস্ব সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে এনবিআর’কে ‘রাজস্ব নীতি’ এবং ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’—এই দুই ভাগে ভাগ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে প্রশাসনিক জটিলতায় সেই উদ্যোগ থমকে যায়। অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত না হওয়ায় তা পরে কার্যকারিতা হারায়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad