মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে না নামা পর্যন্ত নীতি সুদহার ১০ শতাংশে ধরে রাখা, খেলাপি ঋণ দ্রুত কমাতে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ি করা – চলমান ঋণ প্যাকেজের পরবর্তী কিস্তি পেতে নতুন সরকারের সামনে এমন একগুচ্ছ শর্ত তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। গেল সপ্তাহে বাংলাদেশ সরকারসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে হওয়া বৈঠকে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
তবে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকগুলোকে প্রাথমিক আলোচনা হিসেবে দেখছে উভয় পক্ষ; আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে আগামী ১৩ থেকে ১৮ এপ্রিলে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বসন্তকালীন সভার পর।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন। পরদিন বুধবার একই স্থানে মিশন প্রধান ক্রিস পাপাজর্জির নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল গভর্নরের সঙ্গে রোডম্যাপের কাঠামো ও বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করে।
বৈঠকগুলোতে উপস্থিত থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা টাইমসকে জানান, নির্বাচিত সরকারের অধীনে সংস্কার কর্মসূচি কীভাবে এগোবে, তা বোঝার জন্য আইএমএফ একটি নতুন রোডম্যাপ চেয়েছে। এই রোডম্যাপের অংশ হিসেবে কিছু নীতিগত বিষয় আলোচনায় এসেছে।
এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত নীতি সুদহার ১০ শতাংশে ধরে রাখার বিষয়টি রয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপে স্বচ্ছতা বাড়াতে বাজার থেকে ডলার কেনার বিষয়ে আইএমএফকে অবহিত রাখার কথাও বলা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের সুশাসন জোরদারে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও ক্ষমতা দেওয়ার জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন এবং দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণের জন্য প্রণীত ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ হালনাগাদের বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে এসেছে।
খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয়েও আইএমএফ একটি কাঠামোবদ্ধ পরিকল্পনা দেখতে চায়। ঘন ঘন পুনঃতফসিল কমানো এবং ব্যাংকভিত্তিক খেলাপি ঋণ কমানোর সময়সূচি নির্ধারণের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে বলেন, ‘আইএমএফের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকও চায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত নীতি সুদহার না কমাতে। তাই সংস্থাটির চাওয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বিমত নেই।’
আইএমএফের প্রতিনিধিদল একদম প্রাথমিক আলোচনা করে গেছেন উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিনিধিদল মূলত সরকারকে একটা বার্তা দিয়ে গেছেন। সরকারের পরিকল্পনাও তারা বোঝার চেষ্টা করেছেন। মূল আলোচনা হবে ওয়াশিংটনে, আগামী এপ্রিলের স্প্রিং মিটিংয়ে। এর ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের ঋণের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘আইএমএফ বাংলাদেশের রিজার্ভ পরিস্থিতি, ডলারের বিনিময় হার এবং আর্থিক খাত সংস্কারে অগ্রগতিকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে। তবে তারা একটি সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ চেয়েছে।’
এই আলোচনা এমন সময়ে হচ্ছে, যখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তেল ও এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করতে সরকার কয়েকশ কোটি ডলার বৈদেশিক অর্থায়নের খোঁজ করছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সম্প্রতি রয়টার্সকে বলেছেন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি জানান, বিদ্যমান কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ থেকে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার পাওয়া যেতে পারে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত ২৫ থেকে ৫০ কোটি ডলার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু করে, যা পরে বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার করা হয়। এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে দেশ, বাকি রয়েছে ১৮৬ কোটি ডলার।
গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের কথা থাকলেও নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে তা স্থগিত রাখে সংস্থাটি।
আগামী এপ্রিলে স্প্রিং মিটিংয়ের পর একটি রিভিউ মিশন বাংলাদেশ সফর করবে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।


