অস্বাভাবিক বিলের নেপথ্যে মিটার রিডারদের অবহেলা?

অস্বাভাবিক বিলের নেপথ্যে মিটার রিডারদের অবহেলা?
প্রতীকী ছবি এআই দিয়ে তৈরি।
Advertisement
Advertisement

রাজধানীর ইস্কাটনের গাউসনগরের বাসিন্দা আ ক ম ইকবাল হোসেনের জুন ও জুলাই মাসের বিদ্যুৎ বিলের যে পার্থক্য সেটি অস্বাভাবিক। জুনে বিল যেখানে ছিল ১১ হাজার ৫৩৭ টাকা, সেখানে জুলাইয়ে তা দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৮২৫ টাকা।

একই ভবনের রুফিজা খাতুনের বাসায় জুনের বিল ছিল ১ হাজার ৬৬৭ টাকা, জুলাইয়ে তা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৬৪ টাকা।
সেই ভবনের সব বাসিন্দার ক্ষেত্রেই একই ঘটনা ঘটেছে। জুলাইয়ে বিদ্যুতের বিল ১৭ শতাংশ বাড়লেও সবার বিল দ্বিগুণের কাছাকাছি, ক্ষেত্রবিশেষে তিন গুণের কাছাকাছি এসেছে।

পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল বিলের এই কম বেশি হওয়ার কারণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্যের কারণে নয়।

সেই বাড়ির কেয়ারটেকার শহীদুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, মে মাসে মিটার রিডার ২১ তারিখে এসে মিটার দেখে গেছেন, কিন্তু জুনে বাড়তি সময়ের ইউনিট যোগ হয়েছে, এ কারণে জুলাইয়ে বিল এসেছে বেশি।

বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে ইউনিট যত বেশি হয়, ইউনিটপ্রতি দামও তত বাড়ে।

ইকবাল হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘আমার বিল স্বাভাবিকভাবে ১৮ হাজারের মতো থাকে। কিন্তু জুনে ১২ হাজারের কম বিল দেখে অবাক হয়েছি। কিন্তু তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছি জুলাইয়ের বিল দেখে। অতীতে এক মাসে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা এসেছে। কিন্তু এতটা কখনও আসেনি।’

কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি ওয়াইফকে (স্ত্রী) বলেছি গত ছয় মাসের বিল বের করতে। দেখব মিটার রিডার ঠিকমতো এন্ট্রি দিয়েছেন কি না। পরে ডিপিডিসির (বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি) কাছে যাব। আমার ধারণা মিটার রিডার ইউনিটটা ঠিক মতো দেখে না।’

সেই বাড়িতে মিটার দেখার দায়িত্ব সুহায়েবুর রহমানের। তিনি স্বীকার করেন, মে মাসে ২১ দিনের আর জুনে ৩৮ দিনের ইউনিটের ওপর বিল হয়েছে।

এক প্রশ্নে তিনি জানান, তাদেরকে প্রতি মাসের ২০ তারিখ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে বিল সংগ্রহের নির্দেশ আছে। তবে ৩০ দিনের বিলই করতে হয়।

কিন্তু এটা স্পষ্ট যে, তিনি এই নীতিমালা ভঙ্গ করেছেন এবং ইউনিট বেড়ে যাওয়ার কারণে পরের মাসে বাড়তি হারে বিল আসায় ব্যবহারকারীদের বিল অনেকটাই বেড়ে গেছে।

মিটার রিডারদের এভাবে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ নতুন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই তারা গড় বিল করে থাকেন এবং যদি ইউনিট জমতে থাকে, সেগুলো অর্থবছরের শেষ কয়েক মাসে গিয়ে সমন্বয় করা হয়। ভূতুরে বিল বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বিলের অভিযোগগুলো সে সময়েই পাওয়া যায়।

এ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে আলোচনা থাকলেও এর কোনো সমাধান বের করতে পারেনি বিদ্যুৎ বিভাগ।

একজনের মিটারের বিল আরেকজনের নামে

খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা নাজমাতুস সাদিয়ার বিদ্যুৎ বিল জুনে ছিল তিন হাজার ৮০০ টাকার মতো ছিল। জুলাইয়ে তা ১০ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে দেখে হতবাক হয়ে যান। পরে ছুটে যান বিদ্যুৎ অফিসে।

আরও পড়ুন

সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, একই ভবনের অন্য একটি মিটারের রিডিং ধরে তার বাসায় বিল পাঠানো হয়। পরে বিদ্যুৎ বিভাগ সেটি সংশোধন করে দেয়।

বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির কার্যালয়ে গেলেই চোখে পড়ে বিল নিয়ে ঝামেলায় পড়া মানুষদের ভিড়। তাদের সবার ভাগ্য সাদিয়ার মতো হয় না।

তারা ঘুরছেন, জবাব পাচ্ছেন না

অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ নিয়ে আদাবরে ডিপিডিসি কার্যালয়ে গিয়ে সমাধান পাননি মনির হোসেন নামে একজন।

তার বাসায় সাধারণত মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে। কিন্তু জুলাইয়ে বিল এসেছে ৪২ হাজার টাকা।
‘কয়েকবার এই অফিসে এসেছি। প্রতিবার পুরো একটা দিন নষ্ট হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সমাধান পাইনি,’ টাইমসকে বলেন তিনি।

একই কার্যালয়ে দেখা হয় আদাবরের বাসিন্দা আলীম শেখের সঙ্গে। তারও জুলাইয়ের বিল এসেছে ৩২ হাজার টাকা, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে বিল থাকে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে।

তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে শুধু অফিসে ঘুরছি। প্রতিবারই নতুন কথা বলে। কিন্তু সমস্যার সমাধান কেউ করে না।’
সেই কার্যালয়ে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে অন্তত ২০ জনকে অভিযোগ নিয়ে আসতে দেখা গেল। সবারই অভিযোগ, প্রকৃত ব্যবহারের সঙ্গে বিলের কোনো মিল নেই।

তারা সবাই এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘোরেন, শেষে ফেরেন হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে। কর্মকর্তারা দাবি করতে থাকেন, তাদের বর্তমান বিল অস্বাভাবিক নয়।

ডিপিডিসির আদাবর কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী অহিদুল হক টাইমসকে বলেন, ‘অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ নিয়ে প্রায়ই গ্রাহকেরা আসছেন। অনেকের সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করা হচ্ছে। যাদের ক্ষেত্রে সমস্যা পাওয়া যাচ্ছে না, তাদের বুঝিয়ে বলা হচ্ছে।’

তার দাবি গরমের সময় বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি আর ট্যারিফ বাড়ার কারণে অনেকের বিল আগের তুলনায় বেশি এসেছে।

তবে সব অভিযোগ যে ভিত্তিহীন, সেটিও বলছেন না তিনি। তার দাবি, অভিযোগ নিয়ে আসা গ্রাহকদের মধ্যে পাঁচ থেকে সাত শতাংশ ক্ষেত্রে প্রকৃত সমস্যা পাওয়া যায়।

হটলাইন করেছে সরকার, কিন্তু ফায়দা নেই

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। যেসব গ্রাহক এমন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তাদের সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসে অথবা হটলাইনে অভিযোগ জানানোর অনুরোধ জানিয়েছে বিভাগটি।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গত ২৯ জুন এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছে সংবাদ মাধ্যমে। এতে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল এলে সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থা বা কোম্পানি কিংবা হটলাইনে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানানো হয়।

হটলাইন নম্বরগুলো হলো: বিদ্যুৎ বিভাগের কেন্দ্রীয় সেবা ১৬৯৯৯, বিপিডিবির কল সেন্টার ১৬২০০, পবিবোর কল সেন্টার ১৬৮৯৯, ডিপিডিসির কল সেন্টার ১৬১১৬, ডেসকোর কল সেন্টার ১৬১২০, নেসকোর কল সেন্টার ১৬৬০৩ এবং ওজোপাডিকোর কল সেন্টার ১৬১১৭।

তবে যেখানে কার্যালয়ে গিয়েই সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে হটলাইনে অভিযোগ করলে আর কী হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

বিক্ষুব্ধ গ্রাহকদের কর্মসূচি

অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদ এখন শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি রাজশাহীতে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড-নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছে।

সেখানে ভূতুড়ে বিল বাতিল, প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের ভিত্তিতে নতুন বিল, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের বিল সমন্বয় এবং বিশেষ অভিযোগ সেল গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। দাবি বাস্তবায়ন না হলে বৃহত্তর আন্দোলনেরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে ২ জুলাই বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখের সভাপতিত্বে সারাদেশের জেলা প্রশাসক ও বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের নিয়ে এক পর্যালোচনা সভা হয়। সেখানে অসদুপায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম অবশ্য দাবি করেছেন, পাঁচ কোটি গ্রাহকের মধ্যে কয়েকজনের ক্ষেত্রে মিটার রিডিংয়ের ভুল হয়েছে।

‘যেসব অভিযোগ এসেছে, যাচাই করে দেখা গেছে অধিকাংশই সঠিক নয়। তার দাবি, বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় অনেকের বিলও বেড়েছে’, বলেন তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad