কুড়িগ্রামের এবড়োখেবড়ো পথে ভ্যান চালান পঞ্চাশোর্ধ্ব শ্রী সংকর বর্মণ। ঠোঁটে গুনগুন করে ভাওয়াইয়ার করুণ সুর। পেশায় তিনি ভ্যানচালক হলেও তার পরিচয় আরও গভীর; তিনি রংপুর আঞ্চলিক বেতার কেন্দ্রের একজন তালিকাভুক্ত শিল্পী। অভাবের যাঁতাকলে পিষ্ট এই গুণী শিল্পীর জীবনসংগ্রাম আজ উত্তরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতি ভাওয়াইয়ার রুগ্ন দশার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
তিন সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দিতে সংকর বর্মণকে ভাওয়াইয়ার সুর ছেড়ে ভ্যানের হাতল ধরতে হয়েছে। বছরে কয়েকবার বেতারে গাওয়ার সুযোগ পেলেও সম্মানী পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। সেই সামান্য অর্থ দিয়ে যাতায়াত খরচ মেটাতেই তিনি হিমশিম খান।
তার মতে, সরকার যদি বাজেট বাড়িয়ে শিল্পীদের দেখভাল না করে, তবে নতুন প্রজন্ম এই সুপ্রাচীন শিল্পে আগ্রহ হারাবে।
কুড়িগ্রামের এই জনপদে ভাওয়াইয়া এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে ধুঁকছে। ‘ভাওয়াইয়া যুবরাজ’ কছিম উদ্দিনের স্মৃতিবিজড়িত এই অঞ্চলে গাড়িয়াল বা মইষালদের বিরহ-প্রেমের গানের সমঝদার দ্রুত কমে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি এখানে দক্ষ সংগঠকের বড়ই অভাব। ফলে ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় বাঙালির এই অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
উলিপুর উপজেলার পাঁচপীর এলাকায় পাঁচ শতক জমিতে কোনোমতে টিকে আছে বাংলাদেশ ভাওয়াইয়া একাডেমি। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ভূপতি ভূষণ বর্মা জানান, ১৯৯৩ সাল থেকে তারা প্রতিকূলতার মাঝেও শিল্পী তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এখান থেকে অনেক শিল্পী ও গীতিকার বের হলেও দক্ষ সংগঠকের অভাবে এই লোকসংগীতকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
রংপুর আঞ্চলিক বেতার কেন্দ্রে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাবে আগের মতো নিয়মিত গানের আয়োজন হয় না বলেও তিনি আক্ষেপ করেন।
উত্তরের লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা রেডিও চিলমারীর ব্যবস্থাপক বশির আহমেদ মনে করেন, এ অঞ্চলে গুণী শিল্পীর অভাব নেই। তবে এই শিল্পীদের যোগ্য স্থানে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। প্রকৃত রস সমৃদ্ধ শিল্পীদের খুঁজে বের করে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে পারলে ভাওয়াইয়া আবার তার হারিয়ে যাওয়া প্রাণ ফিরে পাবে।
প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এই গানের গুরুত্ব না থাকায় সংকট আরও গভীর হয়েছে। সংগীত পরিচালক শফিকুল ইসলাম শফির মতে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পাঠপরিক্রমায় ভাওয়াইয়া গানের প্রশিক্ষণের জন্য কোনো আলাদা ব্যবস্থা নেই। এমনকি বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠানসূচিতেও ভাওয়াইয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ থাকে না। এসব উপেক্ষা ও অবহেলাই ভাওয়াইয়াকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার জসীম উদ্দিন জানান, বর্তমানে একাডেমিতে ভাওয়াইয়ার জন্য আলাদা কোনো ক্লাসের ব্যবস্থা নেই। সাধারণ সংগীত ক্লাসের সামান্য পরিসরেই কোনোমতে এই গানের তালিম দেওয়া হয়।
তবে তিনি আশার কথা শুনিয়ে জানান, পুরাতন শহরে ২৫ শতক জায়গার ওপর একটি স্বতন্ত্র ভাওয়াইয়া একাডেমি করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে হয়তো ভাওয়াইয়া চর্চার বিস্তারে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।


