অসুস্থ মায়ের জন্য ছাদে আনার রোপণ করেই সফল আলামিন

অসুস্থ মায়ের জন্য ছাদে আনার রোপণ করেই সফল আলামিন
নিজের ছাদ বাগানে আলামিন। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

ক্যান্সারে আক্রান্ত মা লাভলী বেগমকে নিরাপদ ও ফরমালিনমুক্ত আনার খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসক। কিন্তু বাজারের আনারে রাসায়নিক থাকার আশঙ্কা। তাই মাকে নিরাপদ ফল খাওয়াতে বাসার ছাদে আনার চাষ শুরু করেন আলামিন। ধীরে ধীরে গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে সেদিকেই মন দেন তিনি।

শুরুটা ছিল কয়েকটি গাছ দিয়ে। তারপরও মাকে নিজের বাগানের আনার খাওয়ানোর স্বপ্ন পূরণ হয়নি তার। ২০২৫ সালের মে মাসে মারা যান লাভলী বেগম। তবে মায়ের স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে আনার চাষ করে এখন সফল উদ্যোক্তা হয়েছেন টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার তরুণ আলামিন। ধীরে ধীরে সেই উদ্যোগ বড় হয়ে এখন পরিণত হয়েছে সফল ছাদ বাগানে।

আধুনিক পদ্ধতিতে আনার চাষ এবং কলমের মাধ্যমে চারা উৎপাদন ও বিক্রি করে নিজের ভাগ্য বদলানোর পাশাপাশি স্থানীয় অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন তিনি।

বাসাইল উপজেলার হাবলা ইউনিয়নের পাটখাগুড়ি গ্রামের আলামিনের ছাদ বাগানে এখন রয়েছে ২৬ জাতের ৬০টি বড় আনার গাছ। প্লাস্টিকের ড্রামে এসব গাছের মধ্যে রয়েছে ভারতের মহারাষ্ট্রের সুপার ভাগোয়া, মৃদুলা, গুজরাটি আনার, থাইল্যান্ডের থাই আনার, অস্ট্রেলিয়ার বিগ থাই, রিমন, মেক্সিকান, পাকিস্তানি আনারসহ বিভিন্ন জাত।

বছরে দুই মৌসুমে—বর্ষা ও শীতে এসব গাছে ফলন পান আলামিন। আনার ও কলমের চারা বিক্রি করে খরচ বাদে বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় করছেন তিনি।

সরেজমিনে আলামিনের ছাদ বাগানে গিয়ে দেখা যায়, আনারের ভারে গাছের ডাল নুয়ে পড়েছে। কোনো কোনো গাছে ঝুলছে পাকা ফল, আবার কোথাও ফুটে আছে লাল রঙের ফুল। সবুজ পাতার ফাঁকে লাল ফুল ও আনারের সমন্বয়ে ছাদজুড়ে তৈরি হয়েছে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।

প্রতিটি গাছে রয়েছে ২৫ থেকে ৩০টি করে আনার। লাল ও সবুজের মিশেলে পুরো ছাদ বাগান এখন হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয়। বাগানের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে আলামিনের মুখে। সেই হাসির আড়ালে রয়েছে মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও হারানোর কষ্ট।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আলামিনের সফলতা দেখে অনেকেই এখন আনার চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তার কাছ থেকে চারা নিয়ে অনেকে ছাদে বাগান করছেন। এতে এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে আনার চাষের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।

আরও পড়ুন

আলামিন বলেন, ২০২৩ সাল ছিল তার জীবনের কঠিন সময়। ওই সময় তার মা লাভলী বেগম ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তখন তিনি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। চিকিৎসক মাকে আনার ফল খাওয়ানোর পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, বাজারের আনারে রাসায়নিক থাকার আশঙ্কা ছিল। এ ছাড়া তখন বাজারে ভালো মানের আনার কিনতে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাগত, যা তার জন্য কষ্টসাধ্য ছিল। মাকে নিরাপদ ফল খাওয়ানোর জন্য প্রথমে বাড়ির উঠানে আনারের চারা লাগান।

পরে ইউটিউবে ছাদে আনার বাগান করার ভিডিও দেখে আগ্রহী হন। এরপর গাজীপুরের টঙ্গী থেকে কয়েকটি আনারের চারা কিনে ছাদের ড্রামে রোপণ করেন। মায়ের শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তিনি চাকরি ছেড়ে আনার চাষে আরও মনোযোগ দেন।

আলামিন বলেন, প্রথমবার ভালো ফলন পাওয়ার পর তিনি বিভিন্ন জাতের আনার সংগ্রহ শুরু করেন। নিয়মিত পরিচর্যা, সময়মতো সার প্রয়োগ ও সেচ দেওয়ার কারণে এবারও ভালো ফলন পেয়েছেন।

চাকরি ছাড়ার এক সপ্তাহ পরই ২০২৫ সালের মে মাসে আলামিনের মা মারা যান। মায়ের জন্য শুরু করা বাগানটি এরপরও থামাননি তিনি। বরং ধীরে ধীরে বাড়িয়েছেন বাগানের পরিধি।

তিনি বলেন, নিজের হাতে কলম করা আনারের চারা এখন দেশের বিভিন্ন এলাকার ছাদ বাগানে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আনার চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। যারা ছাদ বাগান করছেন, তাদের কাছে আনারের চারা পৌঁছে দেওয়াই তার লক্ষ্য।

আলামিন জানান, তার বাসার ছাদ ও জমিতে এখন প্রায় দুই হাজার আনারের চারা রয়েছে। ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে তিনি চারা বিক্রি করেছেন। ছাদের ৬০টি আনার গাছে এখন প্রচুর ফল ধরেছে। পাশাপাশি আঙ্গুর, কমলা ও মাল্টার চাষও করছেন তিনি।

তিনি বলেন, আনার ও কলমের চারা বিক্রি করে খরচ বাদে বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা আয় করছেন। ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও এসব চারা ও আনার বিক্রি করেন।

আলামিন জানান, ছাদ বাগানের কাজ তিনি নিজেই করেন। প্রয়োজন হলে শ্রমিক নিয়োগ করেন। যারা তার কাছ থেকে আনারের চারা নেন, তাদের ছাদ বাগান করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেন।

বাসাইল উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবু ইলিয়াস তালুকদার বলেন, আলামিন উপজেলার একজন সফল তরুণ উদ্যোক্তা। তিনি ছাদে আনার বাগান করার পাশাপাশি কলমের মাধ্যমে চারা উৎপাদন করে বিক্রি করছেন। তার বাগানের চারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad