অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর তদন্ত করবে নবগঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, যে সব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া পাবে সেগুলোর বিরুদ্বে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার মইনুল ইসলাম চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে পাঁচ সদস্যের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্ন্তবর্তী সরকার। কমিশনের বাকি চার সদস্য হলেন- গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নুর খান ও নাবিলা ইদ্রিস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম ও মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান।
মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘কমিশন নিশ্চয় তদন্ত করবে যেহেতু মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। যদি সাবসটেন্স থাকে, আমার প্রিলিমিনাররি একটা স্ক্রুটিনি করব।’
কমিশন বসার পর কতগুলো অভিযোগ পেয়েছে তা খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেবে বলেও জানান তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তলানিতে ঠেকে। অসংখ্য মানুষ বিচারবর্হিভূত হত্যার শিকার হয়।
গণঅভ্যুত্থানের পর অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের গঠন করা কমিশনের চেয়ারম্যানসহ অন্য কমিশনারদের জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ফলে অর্ন্তবর্তী সরকারের পুরোটা সময় ধরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল। ফলে এই সময়ে কোনো ভুক্তভোগী মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো বিচার পায়নি।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী ১৭ মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১৯৫ জন নিহত এবং ১১ হাজার ২২৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫৯ জন, আহত হয়েছেন আরও ৩১৩ জন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন অন্তত ৮৩৪ জন সাংবাদিক। কারাগারে ৪৪ জন কয়েদী ও ৮৩ জন হাজতির মৃত্যু হয়েছে। নারী ও কন্যা শিশুর নির্যাতনের শিকার হওয়ার সংখ্যা দুই হাজার ৬১৭। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা আইনে ৪১টি মামলা হয়েছে এবং ৩৩ জনকে আটক করা হয়েছে।
মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম বলছেন, কমিশন অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অবশই তদন্ত করে দেখবে।
তিনি বলেন, ‘কোন ধর্ম, কোন বর্ণ, কোন জাতি বা কোন সরকারের আমলে লঙ্ঘন হয়েছে সেটা মানবাধিকার কমিশন বিবেচনা নেয় না, মানবাধিকার লঙ্ঘন হলে তার তদন্ত করা হবে।’
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, ২০২৫ সালের অন্যতম গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন মব সন্ত্রাস করে গণপিটুনিতে হত্যাকাণ্ড। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে নিহত হয়েছিলেন অন্তত ১২৮ জন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, অন্তবর্তী সরকারের শাসনামলে কমপক্ষে ২৯৩ জন নাগরিক মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে। নারী, পুরুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক অনেক মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা, বাউল সম্প্রদায়ের মানুষসহ অনেককে হেনস্থা করা হয়েছে, মারধর, জুতার মালা পড়ানোর ঘটনা ঘটেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ২০২৫ সালে ঢাকা জেলায় সর্বাধিক ২৭, গাজীপুরে ১৭ নারায়ণগঞ্জে ১১, চট্টগ্রামে নয়, কুমিল্লায় আট, ময়মনসিংহ, বরিশালে, নোয়াখালী, গাইবান্ধা ও শরীয়তপুরে ছয়জন করে, লক্ষীপুর, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে পাঁচ জন করে, নরসিংদীত ও যশোরে ৪ জন করে কমপক্ষে ১৯৭ জন ব্যক্তি নির্মম ভাবে নিহত হয়েছেন।
এদিকে নতুন মানবাধিকার কমিশনের আরেক কমিশনার নুর খান বর্তমানে থাইলল্যান্ডে আছেন। অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়ে ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তদন্ত করবেন কি না তা জানতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি দেশে এসে পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
নির্বাচনের কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নির্বিচারে আটক করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে গুমসহ ভয় ও দমনের যে পরিবেশ ছিল, তার কিছুটা শেষ হয়েছে মনে হলেও অন্তর্বর্তী সরকার হাজার হাজার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বিচারে আটক করেছে।


