ময়মনসিংহের তারাকান্দায় জোর করে বৃদ্ধ হালিম উদ্দিনের চুল-দাড়ি কেটে নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ জানিয়েছেন, হিউম্যান সার্ভিস বাংলাদেশ নামে একটি ফেসবুক পেজের সঙ্গে জড়িতরা এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। মুফতি সোহরাব নামে ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক ব্যক্তি এই উদ্যোগের প্রধান। বৃদ্ধ হালিমের চুল কাটার ভিডিওতেও তাকেই দেখা গেছে।
বাংলা ফ্যাক্টের অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে ফেসবুক পোস্টে ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ‘সম্প্রতি এক বৃদ্ধকে জোর করে চুল ও দাড়ি কাটার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। বৃদ্ধের নাম মো. হালিম উদ্দিন। ঘটনাটি ঘটেছে, ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলার কাশিগঞ্জ বাজার এলাকায়। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ভিডিওর ঘটনা তিন মাস আগের বলে জানা যায়।’
‘অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, হিউম্যান সার্ভিস বাংলাদেশ নামের পেজ থেকে ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে অন্তত তিনজন জড়িত। তারা নিয়মিত গৃহহীন ও পরিবারহহীন মানুষের চুল-দাড়ি কাটার ভিডিও তৈরি করেন এবং ফেসবুক ও ইউটিউবে আপলোড করেন। মানুষদের জন্য স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও মৌলিক সহায়তা দেওয়ার নামে প্রচার করা হয়।’
আগে এই পেজটি অন্য নামে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ভিডিও তৈরি করে আয়ের জন্য ব্যবহৃত হতো বলে জানিয়েছেন ফারুক ওয়াসিফ। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ভিডিও তৈরিতে নেওয়া হতো ১৪০০ টাকা। তবে শুরুতে এর নাম ছিল ভিন্ন।
পেইজটির ভিডিওতে ঘুরে-ফিরে তিন থেকে চারজনকে জোর করে অন্যদের চুল-দাড়ি কাটতে দেখা গেছে। এসময় তাদের পরনে থাকে হিউম্যান সার্ভিস বাংলাদেশের লোগো সম্বলিত ভেস্ট। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া বৃদ্ধ হালিমের ভিডিওটিতেও দুইজনের গায়ে একই ভেস্ট দেখা গেছে।
আলোচিত ভিডিওটি এখন পেজটিতে নেই। এমনকি সেখানে যে ফোন নম্বর দেওয়া আছে সেটিও বন্ধ পাওয়া গেছে।

বৃদ্ধ হালিমের চুল দাড়ি কাটার যে কাজ সেটি যে হিউম্যান সার্ভিস বাংলাদেশ টিমের, তা তাদের ভেস্ট ও ব্যক্তিদের দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে জানান ফারুক ওয়াসিফ।
বাংলা ফ্যাক্টের অনুসন্ধানের বরাতে তিনি বলেন, ‘পেজটি প্রথম চালু হয় ২০২০ সালের জুন মাসে। তখন এর নাম ছিল বিডি দ্য বেস্ট। পরে ২০২৪ সালের মে মাসে নাম বদলে হয় নিউজ ৬৪। ওই বছরের আগস্টে নাম হয় আফসার স্টুডিও। চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি পেইজটির নাম আবার বদলে রাখা হয় হিউম্যানি সার্ভিস বাংলাদেশ। এই নাম বদলের পরেই ভিডিওগুলোতে লোগো সম্বলিত ভেস্ট পরা ব্যক্তিদের দেখা যায়।’
আলোচিত টিমটির ইউটিউব চ্যানেল হিউম্যানিটি ফার্স্ট বিডিতে তিনজন প্রতিনিধির নাম রয়েছে। এরা হলেন, মো. আফসার আহমেদ, মুফতি সোহরাব ও মো. বেলাল মিয়া।
মুফতি সোহরাব বাংলাফ্যাক্টকে জানিয়েছেন, তিনি এই উদ্যোগের প্রধান।
ভিডিও নির্মাণ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনার ব্যাপারে তাদের খুব বেশি অভিজ্ঞতা নেই বলেও স্বীকার করেন তিনি।
সোহরাব বলেন, ‘উদ্যোগ নেওয়ার পর তারা বুঝতে পারেন যে এর মাধ্যমে অর্থ আয় করা সম্ভব।’
এরপর তারা বিডি দ্য বেস্ট পেইজের মালিক মো. আফসারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যিনি পরে পেইজের নাম পরিবর্তন করেন।
পেজের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগে মো. আফসার পার্ক, সিনেমা হলসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে মানুষকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করে ভিডিও কন্টেন্ট বানাতেন। প্রেম, কলহ ইত্যাদি নিয়ে অভিনীত ছোট ছোট ভিডিওগুলো তার পেইজে দেখা যায়। তবে ২০২৪ সালের কোনো কন্টেন্ট আর তার পেইজে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সোহরাব হোসেন জানান, তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুরে থাকেন এবং বর্তমানে বেকার। তিনি বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে আরবিতে পড়ান। ফেসবুক ভিডিও থেকে আয় হলেও তা ‘ভালো কাজে’ ব্যবহার করা হয় বলে তার দাবি।
টিমের অন্য সদস্য বেলাল মিয়া পেশায় সিএনজি চালক।
তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে এই কার্যক্রম পরিচালনা করেন বলে জানান সোহরাব। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যোগাযোগ করা হলে তারা সেখানে যান। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ঘটনায় নেত্রকোণার এক ব্যক্তি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা সেখানে পৌঁছেন।
সোহরাব হোসেন জানিয়েছেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন।
পেজের মূল এডমিন মো. আফসারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। সোহরাবের ভাষ্য অনুযায়ী, মূলত আফসারই ভিডিও তৈরি ও আপলোডের দায়িত্বে থাকেন।


