বাংলার সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্যের অনন্য মেলবন্ধন আর প্রাচীন মুসলিম ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে ঝালকাঠির গালুয়া পাকা মসজিদ। তবে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ আর দীর্ঘদিনের অবহেলায় এই ঐতিহাসিক নিদর্শনের জৌলুস এখন নিভু নিভু। সংস্কারের অভাবে ধুঁকতে থাকা এই স্থাপত্যটি এখন তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের অপেক্ষার প্রহর গুনছে।
রাজাপুর উপজেলার গালুয়া ইউনিয়নের ভাণ্ডারিয়া-রাজাপুর মহাসড়ক থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে নিঝুম পরিবেশে এই মসজিদের অবস্থান। এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের কারুকাজে সুলতানি ও মুঘল আমলের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। পাকা ইট ও চুন-সুরকির মিশ্রণে তৈরি দেওয়ালে খোদাই করা চমৎকার সব নকশা ও শৈল্পিক কারুকার্য প্রাচীন মুসলিম সংস্কৃতির আভিজাত্য প্রকাশ করে। মসজিদটি ঠিক কবে নির্মিত হয়েছিল তার সঠিক দিনক্ষণ জানা না গেলেও, এর স্থাপত্যশৈলীই এর প্রাচীনত্বের সাক্ষ্য দেয়।
মসজিদটি ঘিরে রয়েছে অলৌকিক সব লোককাহিনী। স্থানীয়দের বয়ান অনুযায়ী, বাংলা ১১২২ সালে মাহমুদ জান আকন্দ নামক এক ব্যক্তি ঘন জঙ্গলে আবৃত অবস্থায় এটি প্রথম আবিষ্কার করেন। জনশ্রুতি আছে, জঙ্গল পরিষ্কারের সময় সেখানে বড় বড় সাপের উপস্থিতি দেখা গেলে তাদের মসজিদ ছাড়ার অনুরোধ জানানো হয়। তখন সাপগুলো স্বেচ্ছায় মসজিদ ছেড়ে চলে যায়। এই রহস্যময় ইতিহাসের কারণে স্থানীয়দের কাছে এটি ‘জীনের মসজিদ’ নামেও ব্যাপক পরিচিত। সেই সময় থেকেই আজ অবধি এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হয়ে আসছে।
ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে প্রার্থনার পবিত্র স্থান হওয়ার পাশাপাশি এটি এখন ইতিহাস অনুরাগী ও গবেষকদের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এমন একটি প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ অযত্নে তার শ্রী হারিয়ে ফেলছে। মসজিদের জীর্ণ দশা আর দেয়ালের নোনা ধরা নকশাগুলো জানান দিচ্ছে দীর্ঘদিনের অবহেলার কথা।
মসজিদের ইমাম মাওলানা ওবায়দুল হক আক্ষেপ করে জানান, ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৯৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটিকে সংরক্ষণের আওতায় নিয়েছিল। কিন্তু নথিপত্রে নাম থাকলেও বাস্তবে মসজিদটি সংস্কারের জন্য গত দুই দশকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, এই অমূল্য নিদর্শনের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করা এখন সময়ের দাবি।
যদি দ্রুত এই প্রাচীন স্থাপত্যের সংস্কার ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না হয়, তবে সময়ের গর্ভে হারিয়ে যেতে পারে ঝালকাঠির এই অনন্য মুসলিম ঐতিহ্য।


