ব্যাংকার বাবা-মার ছোট্ট কন্যা নিশাত তাসনিম নুহা। রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। সপ্তাহের তিনদিন অনলাইনে ক্লাস হতে পারে শুনে চিন্তিত তার মা রুহি আলম। কারণ, অনলাইন ক্লাসে যোগ দিতে নুহা নিজে নিজে ডিভাইসে লগ-ইন করতে পারবে না।
রুহি বলেছেন, ‘বড় ছেলে ক্লাস নাইনে পড়ে। সে না হয় সামলে নিতে পারবে। কিন্তু মেয়ে তো ছোট…. আমি বা ওর বাবা না থাকলে ওকে অনলাইনে ক্লাস করাবে কে? বাসায় দুজন হেল্পিং হ্যান্ড থাকলেও তারা তো ওকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে না।’
হঠাৎ এই অনলাইন ক্লাসের আলোচনা তৈরি হয়েছে জ্বালানি সাশ্রয়ের একটি উপায় হিসেবে। বলা হচ্ছে, সপ্তাহে তিনদিন এভাবে আর তিনদিন স্কুলে ক্লাস নেয়ার বিষয়ে ভাবছে সরকার।
যদিও এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, কিন্তু এরই মধ্যে কর্মজীবী মা-বাবারা তাদের সন্তানের শিখন নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। এর পাশাপাশি আছে নিম্ন আয়ের মানুষ, যাদের পক্ষে তাদের সন্তানদের অনলাইনে ক্লাস করানোর মতো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যোগাড় করাই কঠিন। ফলে শিক্ষায় নতুন এক ধরনের বৈষম্যের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই সমস্যাটি দেখা গিয়েছিল করোনাভাইরাস মহামারীর সময়। সে সময় সশরীরে ক্লাস বন্ধ থাকায় অনলাইনেই চলেছিল কার্যক্রম। সে সময় শিক্ষায় বৈষম্যের বিষয়টি সামনে আসে। সম্পদশালী পরিবারের সন্তানরা নিয়মিত ক্লাস করতে পারলেও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুরা কার্যত শিক্ষার বাইরে চলে যায়।
গ্রাম এলাকায় ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এখনও কম, আবার এর জন্য যে বাড়তি খরচ, তা বহু পরিবারের পক্ষে বহন করা কঠিন। শহরের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্যও এই সমস্যা প্রকট। আর এবার অফিস খোলা থাকবে বলে কর্মজীবীদের সন্তানদের একটি বড় অংশের পক্ষেই অনলাইন ক্লাসে যোগ দেওয়া কঠিন।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদও বলছেন, ‘অনলাইনে পাঠদানের ক্ষেত্রে করোনাকালীন অভিজ্ঞতা ভালো না। সেই শিখন ঘাটতি শিক্ষার্থীরা আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাই অনলাইনে পাঠদান আসলে খুব ভালো কিছু হতে যাচ্ছে না।’
জ্বালানি সংকটের কারণে স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়ার মতো অবস্থা হলে অস্থায়ী ভিত্তিতে ‘ডিসট্যান্ট লার্নিং’ সিস্টেম চালু করা যেতে পারে বলে মত দেন তিনি।
সেটি কেমন- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি ইমেইলের মাধ্যমে বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে শেখানোর ব্যবস্থা থাকবে, যেখানে যার সুবিধামত সময়ে কাজগুলো করতে পারবে।’
ভবিষ্যতেও এই ধরনের সমস্যার উদ্ভব হতে পারে- তা ধরে নিয়ে শিক্ষাক্রমকেই নতুন আঙ্গিকে সাজানোর পরামর্শও দিয়েছেন অধ্যাপক মনজুর।
তার মতে, সারা বছরের লেসনগুলো তৈরি করে একটা ওয়েবসাইটে রাখা যেতে পারে। তাহলে শিক্ষার্থীরা তাদের সুবিধামতো সময়ে সেগুলো ডাউনলোড করে বা অনলাইনে বসে সেগুলো থেকে শিখতে পারবে।
যাদের ডিভাইস বা ইন্টারনেট সুবিধা নেই, তাদের নিয়ে আলাদা গ্রুপ তৈরি করে ডিভাইস-ইন্টারনেট সুবিধা প্রদান করা অথবা স্কুলের মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের শিক্ষাকার্যক্রম চালানো যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এ জন্য শিক্ষা বিষয়ক ম্যাটেরিয়াল তৈরি, সবার জন্য ডিভাইস ও কানেকটিভিটি সুবিধা নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দেন মনজুর আহমদ।
অনলাইনে ক্লাস কার্যক্রম চালানোর বিষয়ে ‘নিড বেজড’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশীদ।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘সারা দেশে অনলাইনে ক্লাস কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। যেসব এলাকায় গাড়ি চলাচল নিয়ে সিদ্ধান্তের বিষয় আছে, শুধু সেসব এলাকার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। একটি অ্যাকশন রিসার্চের মাধ্যমে সহজেই স্থানগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব।’
এই শিক্ষকের মতে, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা মূলত হেঁটে বা রিকশা-ভ্যান ব্যবহার করে যাতায়াত করে। ফলে জ্বালানি সাশ্রয়ের সঙ্গে এসব অঞ্চলের ক্লাস কার্যক্রম অনলাইনে নেওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
‘তাছাড়া সবার কাছে ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোনের মতো প্রয়োজনীয় ডিভাইস নেই, ইন্টারনেট সুবিধাও নেই সবখানে। তাই মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলে এখন অনলাইন ক্লাস চালুর প্রয়োজন নেই।’
রংপুর, চট্টগ্রাম ও রাজধানীর কয়েকটি সরকারি স্কুলের শিক্ষক ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয়েছে টাইমস অব বাংলাদেশের। তাদের বেশিরভাগই অনলাইনে ক্লাসের বিরোধী।
এমনকি রাজধানীর সব শিক্ষার্থীও অনলাইনে নিয়মিত ক্লাস করতে পারবেন কিনা তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রিয়াজ পারভেজ।
টাইমসকে তিনি বলেন, ‘যদি সরকার এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে লজিস্টিকস সাপোর্টের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু সেটি কি সম্ভব?’
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক সুজিত কুমার বলেন, ‘অনেক শিক্ষকেরও তো স্মার্ট ফোন নাই, বাটন ফোন ব্যবহার করেন তারা। সেই শিক্ষকরা কীভাবে অনলাইন ক্লাসে অংশ নেবেন?’
বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের যে বেতন, তাতে সবার পক্ষে ডিজিটাল সরঞ্জাম কেনাও সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন এই শিক্ষক।
অনলাইন ক্লাস নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের তোলা এই মতামতগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে যত দ্রুত সম্ভব দুর্বলতাগুলো মেটানোর চেষ্টা করা হবে।’
বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বলেও জানান তিনি।


