সময়ের হিসাব কষে সোহেল রানার বাজিমাত

সময়ের হিসাব কষে সোহেল রানার বাজিমাত
সাপাহার উপজেলার গোডাউনপাড়া এলাকার বরেন্দ্র এগ্রো পার্কের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

ব্যবসা বা কৃষিতে একটু হিসেবি সিদ্ধান্ত কীভাবে লাভবান করতে পারে, সেটি দেখা যাচ্ছে আম চাষে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠা নওগাঁয়। সেখানে কয়েকজন উদ্যোক্তা সময়ের হিসাব করে এমন জাতের আমের বাগান গড়েছেন, যেগুলোতে ফলন আসে মৌসুমের শেষে। এতে ভরা মৌসুমে, যখন চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় দাম পড়ে যায়, সেই সমস্যায় তাদের পড়তে হচ্ছে না।

এমন বাগান গড়ায় উদ্যোক্তারা নিজেরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি ভোক্তারাও আরও বেশি সময় ধরে আমের স্বাদ নিতে পারছেন।

সাপাহার উপজেলার গোডাউনপাড়া এলাকার বরেন্দ্র এগ্রো পার্কের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা এমনই একজন সফল উদ্যোক্তা। তিনি আম বাগান করার সময়ই পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করেছেন, কোন জাত চাষ করলে দাম বেশি পাওয়া যাবে, সেভাবেই এগিয়েছেন। পরে বেছে নেন বারি আম-৪ ও গৌড়মতি জাতকে।

টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, সাধারণ অনেক জাতের আম বিঘাপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ মণ ফলন দিলেও বারি আম-৪ ও গৌড়মতি থেকে ৬০ থেকে ৮০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।

এবার ভরা মৌসুমে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা মণ আম বিক্রি হয়েছে, সেখানে গৌড়মতির বিক্রি শুরুই হয় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা মণ থেকে, আর মৌসুমের শেষ দিকে তা ১৫ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায়।

শীতকালে উৎপাদিত কাটিমন আমের দাম অনেক সময় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মণ পর্যন্ত ওঠে। তবে গৌড়মতি চাষে কিছুটা বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয় বলে জানান তিনি। রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বেশি থাকায় প্রায় শতভাগ ফল ব্যাগিং করতে হয়। এতে বিঘাপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়। তারপরও যে বাড়তি লাভ হয়, সেই তুলনায় এই খরচ কিছু নয় বলেন তিনি। বারি আম-৪ চাষে ব্যয় তুলনামূলকভাবে আরও কম।

এই পথে সোহেল রানার অনেকটা পথ হাঁটতে হয়েছে। ২০১৫ সালের শেষের দিকে গৌড়মতি ও বারি-৪ জাতের চারা রাজশাহীর একটি বেসরকারি নার্সারি থেকে সংগ্রহ করেন। বর্তমানে ২০ বিঘা জমিতে তার আম আছে।

বছর পাঁচকে আগেও জুলাই পেরোলেই দেশের বাজার থেকে প্রায় বিদায় নিত আম। তবে নওগাঁর বিস্তীর্ণ আমবাগানে ভরা মৌসুম শেষে শুরু হচ্ছে আরেক নতুন মৌসুম। গাছে গাছে ঝুলছে গৌড়মতি, বারি আম-৪, আশ্বিনা ও কাটিমনের মতো দেরিতে পাকা নাবি (বিলম্ব) জাতের আম।

এসব আমের চাহিদা রয়েছে তুঙ্গে। আর সেই চাহিদাকেই পুঁজি করে ভরা মৌসুমের তুলনায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি দামে আম বিক্রি করছেন কৃষকরা। কয়েক সপ্তাহ আগেও যারা দাম নিয়ে হতাশ ছিলেন, তারাই এখন লাভের হাসিতে উজ্জ্বল।

আরও পড়ুন

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, বাজারের চাহিদা এবং লাভজনক উৎপাদনের বিষয়টি বিবেচনায় নাবি জাতের আমই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ফলচাষ। আর সেই সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন দৃঢ়ভাবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে নওগাঁ।

দেশের সবচেয়ে বড় আম উৎপাদনকারী জেলা হয়ে ওঠা নওগাঁয় এবার ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে ফলটির আবাদ হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এ বছর জেলায় ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৫০ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য ধরা হয় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।

ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার আম বিক্রি হয়েছে। জেলার প্রায় ১ হাজার ১০০ টন আম বিদেশে রপ্তানি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারেও নওগাঁর আমের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত বহন করে।

তবে এপ্রিলের শুরু থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, নাকফজলি ও হাঁড়িভাঙাসহ জনপ্রিয় বিভিন্ন জাতের আম বাজারে আসে। একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ফল বাজারজাত হওয়ায় সরবরাহ বেড়ে যায় এবং দাম কমে যায়। ফলে অনেক কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে পারলেও প্রত্যাশিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হন।

নাবি জাতের বাগান যারা করেছেন, তাদের গাছে এখনো ঝুলছে পরিপক্ব ফল। আর এসব বাগানের সরবরাহেই সাপাহারের বাজার ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় মুখর।

বর্তমান বাজারে গৌড়মতি আম মানভেদে প্রতি মণ ৬ থেকে ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বারি আম-৪ ও কাটিমনের দাম ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা।

সীমিত পরিমাণে বাজারে আসা আম্রপালি বিক্রি হচ্ছে ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকা মণ এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গোর দাম ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা মণ।

ছবি: টাইমস

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর গৌড়মতি আমের আবাদ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২৫০ হেক্টর। বারি আম-৪-এর আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৪৫ হেক্টরে। আশ্বিনা জাতের আবাদ হয়েছে ৩৫০ হেক্টরে।

থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় বারোমাসি জাত কাটিমনের আবাদ প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৯৯৫ হেক্টরে পৌঁছেছে। চলতি মৌসুমে শুধু নাবি জাতের আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাই ধরা হয়েছে ৭৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন।

জেলার কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা ২০০৩ সালে বারি আম-৪ এবং ২০১২ সালে গৌড়মতি (বারি আম-১২) জাত উদ্ভাবন করেন।

কাটিমন মূলত থাইল্যান্ডের একটি বারোমাসি আমের জাত। বছরের প্রায় সব সময়ই এ জাতের আম উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় মৌসুমের বাইরেও বাজারে এর সরবরাহ থাকে এবং স্থানীয় ভোক্তাদের মধ্যে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

গৌড়মতি ও বারি আম-৪ সাধারণত জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় দুই মাস বাজারে পাওয়া যায়।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান বলেন, নাবি জাতের বা লেইট ভ্যারাইটি আম এখন কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। আগে তিন মাসের মধ্যেই আমের মৌসুম শেষ হয়ে যেত। এখন ছয় থেকে সাত মাস পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে।

নিরাপদ উৎপাদন, আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানিযোগ্য মান নিশ্চিত করা গেলে নাবি জাতের আম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর