ভুল সাজায় ধ্বংস জীবন, ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

ভুল সাজায় ধ্বংস জীবন, ক্ষতিপূরণ দেবে কে?
কার্টুন। সজীব রায়/টাইমস
Advertisement
Advertisement

টানা ১৪ বছর জেলখানার একটি জানালাবিহীন কনডেমড সেলে মৃত্যুযন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটিয়েছেন মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ও মোহাম্মদ সোনারুদ্দিন। মৃত্যুদণ্ডের প্রহর গুনতে গুনতে শেষ পর্যন্ত সেই দিন আর আসেনি।

আট বাই আট ফুটের সেই ছোট্ট ঘরে একসঙ্গে চার থেকে পাঁচজনকে গাদাগাদি করে রাখা হতো। এই সংকীর্ণ স্থানেই পায়খানা ও গোসলের বন্দোবস্ত। কোনো জানালা নেই, দরজাও খোলা হতো শুধু গোসলের সময়। গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরম, ভ্যাপসা আর্দ্রতা আর মানুষের গায়ের উত্তাপে সেলের পরিবেশ হয়ে উঠত চরম অসহনীয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জেলখানার এই জায়গাতেই পাঠানো হয়। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে সাজা কার্যকর হওয়ার অনেক আগেই শুরু হয় এই শাস্তি। উচ্চ আদালত যতক্ষণ না তাদের দণ্ড বাতিল করে খালাস দিচ্ছে, ততক্ষণ তাদের ফাঁসির মঞ্চের ছায়াতলেই কাটাতে হয়।

২০০৬ সালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী গ্রামে নয় বছরের শিশু পারভীন ও তার মা রোকসানা খুন হন। ঘটনার দুই দিন পর গ্রেপ্তার করা হয় ইসমাইল ও সোনারুদ্দিনকে।

২০০৮ সালে বিচারিক আদালত তাদের দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সেদিনই তাদের কনডেমড সেলে স্থানান্তর করে কারা কর্তৃপক্ষ।

পরবর্তীতে ২০২২ সালে আপিল বিভাগ মামলার আপিল পর্যালোচনায় দেখতে পায়, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ নেই। একটি ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের ভিত্তিতেই তাদের অভিযুক্ত করা হয়েছিল। সে বছরের মে মাসে মুক্তি পান ইসমাইল ও সোনারুদ্দিন।

আদালতের রায় তাদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তা ফিরিয়ে দিতে পারেনি জীবনের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান বছর, তাদের শারীরিক ক্ষতি, ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক কিংবা পরিবারের ত্যাগ করা রুজি-রোজির উপায়।

তাদের এই ঘটনা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা উন্মোচন করে দিয়েছে: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে বছরের পর বছর জেল খাটার পর যারা নির্দোষ হিসেবে খালাস পান, তাদের ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের জন্য দেশে কোনো আইন বা ব্যবস্থা নেই।

আইনি লড়াই চালানোর আর্থিক সামর্থ্য না থাকা কিংবা বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারানোর কারণে অনেক ভুক্তভোগীই আর প্রতিকারের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেন না।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সুবিচার শুধু ভুল রায় সংশোধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগীদের জীবন পুনর্গঠনে সহায়তা করাও এর অংশ হওয়া উচিত।

ইসমাইল ও সোনারুদ্দিনের এই অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের নথি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিচারিক আদালতে দেওয়া অনেক মৃত্যুদণ্ডের আদেশই বিচার প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে উচ্চ আদালতে বাতিল, হ্রাস বা পরিবর্তিত হয়।

মৃত্যুদণ্ডবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘ দিন ধরে যুক্ত আলোকচিত্রী মুশফিকুর রহমান জোহান টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্তত ২৯৪ জন ব্যক্তি পরবর্তীতে উচ্চ আদালত থেকে খালাস পেয়েছেন। কেবল গত দুই মাসেই নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পেয়েছেন ২০ জনেরও বেশি মানুষ।

অন্যদিকে, প্রায় ১ হাজার ২০০টি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি কয়েদি এখনো তাদের আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

অনেকের জন্যই শাস্তির সূচনা ঘটে বিচারিক আদালতের রায়ের পরপরই। কনডেমড সেলে কাটানো দীর্ঘ সময় মানে হলো-উচ্চ আদালত অপরাধের সত্যতা নিশ্চিত করার আগেই প্রতিনিয়ত ফাঁসির আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করা।

যদিও হাইকোর্টে বিচারিক আদালতের রায় অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স), আপিল, রিভিউ পিটিশন এবং রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনসহ বেশ কয়েকটি আইনি ধাপ অতিক্রমের পরই কেবল মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়; তা সত্ত্বেও কনডেমড সেলে থাকার কারণে তাদের অনেক আগেই টানতে হয় মানসিক যন্ত্রণা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। আর স্বাধীনতার পর থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট ৪৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে তা আর ফেরানো সম্ভব নয়, তাই এসব ক্ষেত্রে ভুল রায়ের সম্ভাবনা সবসময়ই বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলাটি কীভাবে বিচার প্রক্রিয়ার উচ্চ ধাপে এসে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বদলে যেতে পারে, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

২০১৯ সালে ফেনীর একটি আদালত মামলার ১৬ জন আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সাত বছর পর হাইকোর্ট দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন এবং বাকি ১০ জনকে খালাস দেয়।

তবে দীর্ঘ সময় কনডেমড সেলে থাকার পর যারা খালাস পান, আদালতের এই খালাস তাদের আইনি লড়াইয়ের ইতি টানলেও জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সময় ও ক্ষতির অবসান ঘটাতে পারে না।

ফাঁসির মঞ্চের ছায়াতলে জীবন

ইসমাইল জানান, কনডেমড সেলের দিনগুলো তার মনে চিরস্থায়ী মানসিক ক্ষত সৃষ্টি করেছে। ‘ওখানে থাকলে যেকোনো মানুষ পাগল হয়ে যাবে। কোনো অপরাধ করে সাজা পেলে হয়তো মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু নির্দোষ হয়েও যখন শাস্তি পেতে হয়, তা সহ্য করা যায় না,’ বলেন তিনি।

আরও পড়ুন

‘১৬টা বছর আমার মাথায় কেবল একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খেয়েছে—আমি কেন কারাগারে?’

তিনি এমন কয়েদিদেরও দেখেছেন, যারা মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় ২২ বছরেরও বেশি সময় ধরে কনডেমড সেলে বন্দী ছিলেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুল তদন্ত, দুর্বল প্রমাণ বা বিচারিক ভুলের কারণে ভুল সাজা হতে পারে। অথচ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বন্দীদের কনডেমড সেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যদিও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বেশ কয়েকটি আইনি পর্যালোচনার ধাপ বাকি থাকে।

এই ব্যবস্থাকে সেকেলে ও জরাজীর্ণ বলে আখ্যা দেন আলোকচিত্রী জোহান। তিনি বলেন, ‘যে দেশের বিচারব্যবস্থায় নানা দুর্বলতা রয়েছে, সেখানে কনডেমড সেল মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি উর্বর ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।’

মৃত্যুদণ্ডের আগেই যে শাস্তি শুরু

ইসমাইলের কাছে কনডেমড সেলের মানসিক যন্ত্রণা সেখানকার শারীরিক চরম কষ্টের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। তিনি বলেন, ‘দিন যত যায়, মনে হয় যেন বারবার একটু একটু করে মরে যাচ্ছি। বহু মানুষ সেখানে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। ২৪ ঘণ্টা যেন চোখের সামনে ফাঁসির দড়ি ঝুলতে থাকে।’

সেসব দিনের স্মৃতি এখনো সোনারুদ্দিনকে তাড়া করে বেড়ায়। তিনি বলেন, ‘ফাসি হবে কি হবে না, সেটা ছিল পরের কথা। বড় প্রশ্ন ছিল, একটা মানুষ সেখানে বাঁচে কীভাবে? পশুপাখিকেও তো এর চেয়ে ভালো পরিবেশে রাখা হয়।’

সেলে গাদাগাদি করে থাকা, তীব্র গরম, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর খাবারের চরম সংকট বর্ণনা করে তিনি জানান, প্রায়শই তাদের ভাগ্যে জুটত কেবল ‘এক টুকরো শুঁটকি আর ভাত’।

তিনি আরও জানান, সেলে আসার পর অনেক কয়েদি নিজেদের সামলাতে না পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তেন। কখনো কখনো বাকবিতণ্ডা বা সংঘাতের জেরে তাদের পায়ে ডান্ডাবেড়িও পরিয়ে দেওয়া হতো।

রায় বদলায়, কিন্তু ক্ষত থেকেই যায়

ইসমাইল ও সোনারুদ্দিনের জন্য কারামুক্তি শারীরিক যন্ত্রণার শেষ ঘটাতে পারেনি। দুজনেই অভিযোগ করেন, গ্রেপ্তারের পর তাদের প্রচণ্ড মারধর করা হয় এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হয়।

ইসমাইল বলেন, ‘যে ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা লজ্জাজনক। মুখে বলে বোঝানো সম্ভব নয়।’

সোনারুদ্দিন জানান, কারাগারে পাঠানোর আগে তাকে টানা সাত দিন পেটানো হয়, যার ফলে তার শরীরে স্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি হয়েছে। আফসোসের সুরে তিনি বলেন, ‘এখন আমার চোখে সমস্যা, হাঁটুতে ব্যথা এবং শরীরের প্রতিটি জোড়ায় যন্ত্রণা। আমি আর কোনো কাজ করার মতো অবস্থায় নেই।’

আইনজীবীরা জানান, প্রধানত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে দেওয়া বেশ কিছু সাজা পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে গিয়ে ভুয়া প্রমাণিত হয়ে বাতিল হয়ে গেছে।

গত ১৭ জুন আপিল বিভাগ ফাতিহা মাশকুরা নামে এক নারীকে খালাস দেন, যিনি স্বামী হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হয়ে বছরের পর বছর কনডেমড সেলে কাটিয়েছিলেন।

তার আইনজীবী এস এম শাহজাহান টাইমসকে জানান, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ছাড়া তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছিল না।

ইসমাইল ও সোনারুদ্দিনকেও অপর আসামি তারিকুলের একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে সেই জবানবন্দির কোনো আইনি ভিত্তি টেকেনি।

মুক্তি মিলেছে, কিন্তু জীবন মেলেনি

কারাগার থেকে মুক্তি মিললেও ইসমাইল ও সোনারুদ্দিন তাদের হারিয়ে যাওয়া জীবন আর ফেরত পাননি।

দীর্ঘ আইনি লড়াই আর্থিকভাবে তাদের নিঃশেষ করে দিয়েছে। সোনারুদ্দিন জানান, তার মাথায় এখন ৩ লাখ টাকার ঋণের বোঝা। নিজের চিকিৎসা করানোর মতো ন্যূনতম অর্থও তার কাছে নেই।

অন্যদিকে ইসমাইল জানান, আইনি লড়াইয়ের খরচ চালাতে গিয়ে তার পরিবার জমিজমা, পুকুর এমনকি বসতভিটা পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে।

কিন্তু এই ক্ষতি কেবল টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। ইসমাইল গ্রেপ্তারের পরপরই তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি পরিবারের বেশ কয়েকজন নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুতে শেষ দেখাটুকুও দেখতে পাননি।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আমার চেয়ে বয়সে যারা ছোট ছিল, তারা আজ নাতি-নাতনির মুখ দেখে ফেলেছে, আর আমি নিজের সন্তানটুকুও দেখতে পারলাম না।’

সোনারুদ্দিন জানান, সাজাপ্রাপ্ত আসামির সামাজিক তকমা তার পুরো পরিবারকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

তারা কেউই আর সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জানাতে চান না। ইসমাইল জানান, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা করে জেতার ওপর তার কোনো আস্থা নেই। অন্যদিকে সোনারুদ্দিনের মতে, আইনি প্রক্রিয়ার পেছনে আনুমানিক ৫ লাখ টাকা খরচ করার মতো সামর্থ্য তার একেবারেই নেই।

আদালত ভুল শুধরালে ক্ষয়ক্ষতির দায় নেবে কে?

আইন বিশেষজ্ঞরা জানান, ভুলবশত সাজাপ্রাপ্ত হয়ে পরবর্তীতে খালাস পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই।

২০০১ সালে সিরাজগঞ্জের সুমী রানী হত্যা মামলায় বিচারিক আদালত পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। পরবর্তীতে চারজনই খালাস পান। তাদের আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান বলেন, ভুক্তভোগীরা জীবনের মূল্যবান সময় এবং সর্বস্ব হারান বিধায় তাদের ক্ষতিপূরণের সুনির্দিষ্ট বিধান থাকা উচিত।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী জানান, নির্দোষ ব্যক্তির এই কারাবাস মূলত সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার দুর্বলতাকেই প্রতিফলিত করে।

তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার একটি ত্রুটি। মামলাগুলো যদি স্বল্প বা একটি যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা যেত, তবে এই ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হতো।’

বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)-এ   স্বাক্ষরকারী দেশ, যার ১৪(৬) অনুচ্ছেদে কিছু নির্দিষ্ট শর্তাধীনে ভুল সাজাপ্রাপ্ত এবং পরে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে।

তবে বাংলাদেশ এখনো এই মূলনীতি বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি কাঠামো তৈরি করেনি।

বর্তমানে বিদ্যমান আইনি সুযোগগুলো অত্যন্ত সীমিত। প্যানাল কোডের ২১১ ধারা অনুযায়ী জেনে-বুঝে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলা দায়েরকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আদালতের কাছে এমন কোনো উদ্দেশ্য প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন।

কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা দেওয়ানি মামলা বা সাংবিধানিক রিটের মাধ্যমেও ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন। কিন্তু সেই পথগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, দীর্ঘমেয়াদি এবং তার জন্য আরেকটি নতুন আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম সাইফ বলেন, বিচারিক ভুলের শিকার ব্যক্তিদের জন্য বাংলাদেশে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতিপূরণ স্কিম বা নীতি তৈরি করা দরকার। তার মতে, এ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে ক্ষতিপূরণ প্রদান, পুনর্বাসন, মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সহায়তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পুনরায় সামাজিকভাবে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো অভিযোগকারী যদি সরল বিশ্বাসে মামলা দায়ের করেন, তবে কেবল আসামি খালাস পাওয়ার কারণেই তাকে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। তা না হলে ভবিষ্যতে প্রকৃত ভুক্তভোগীরাও আইনি প্রতিকার চাইতে আদালতে যেতে নিরুৎসাহিত হবেন।

বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব ও সাবেক জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ শাহজাহান সাজু বলেন, কোনো নির্দোষ মানুষকে বছরের পর বছর বন্দী করে রাখা মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘন। কারণ, আদালত কাউকে নির্দোষ ঘোষণা করলেও অন্যায় কারাবাসের ফলে হওয়া ক্ষতি শোধরানো কখনোই সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের উচিত এসব ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীরা যাতে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পান, তার উপযুক্ত পথ তৈরি করা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর