পণ্য পরিবহনে শতকোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা

পণ্য পরিবহনে শতকোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনে সংস্কারকাজ শুরুর পর ভয়াবহ যানজটে অচল হয়ে পড়ে প্রায় ৫০ কিলোমিটার মহাসড়ক।

শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার বেলা ৫টা পর্যন্ত টানা প্রায় ৩২ ঘণ্টা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ পর্যন্ত যানবাহনের তীব্র স্থবিরতা দেখা যায়।

দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে যাত্রী ও চালকদের চরম দুর্ভোগের পাশাপাশি বিপাকে পড়েছে পণ্য পরিবহন। পচনশীল কাঁচামাল, শিল্পপণ্য ও জরুরি সরবরাহ সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের আশঙ্কা, সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার থেকে ২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার আশরিয়ারচরে ঢাকাগামী লেনে সংস্কারকাজ শুরু করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এতে একটি লেন দিয়ে সীমিত পরিসরে যানবাহন চলাচল করতে থাকায় দ্রুত যানবাহনের চাপ বাড়ে। একপর্যায়ে তা দীর্ঘ যানজটে রূপ নেয়।

সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কয়েকটি স্থানে সংস্কারকাজ চলছিল। বিশেষ করে কুমিল্লার পোরশা এলাকার কয়েকটি পয়েন্টে সড়কের অবস্থা নাজুক হওয়ায় যানবাহনের গতি কমে যায়। এর সঙ্গে ছুটির দিনের বাড়তি যানবাহনের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

কবে নাগাদ এই সমস্যা দূর হবে এই বিষয়ে জানতে সড়ক ও জনপথ চট্টগ্রাম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহে আরেফিনকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।

দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রেম দাশ রায় টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, সংস্কারকাজের কারণে প্রথমে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে যানজট ধীরে ধীরে বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। দাউদকান্দি এলাকায় বিকাল ৫টার পর থেকে আর যানজট ছিল না। ভবেরচর, কাঁচপুর এবং মুন্সিগঞ্জ এলাকায় কিছুটা যানজট রয়েছে।

আরও পড়ুন

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকায় দুর্ভোগের সীমা ছাড়িয়ে যায় যাত্রী ও চালকদের। ঢাকামুখী লেনে আনুমানিক ৮০০টি করে আপ-ডাউন মিলিয়ে ১ হাজার ৬০০টিরও বেশি যাত্রীবাহী বাস আটকা পড়ে। বাসগুলোর ৫০ শতাংশ যাত্রী ধারণক্ষমতা বিবেচনায় প্রায় ২০ হাজার যাত্রী এই অচলাবস্থার সরাসরি ভুক্তভোগী হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন আহমেদ।

ফেনী থেকে ঢাকাগামী যাত্রী জাহিদুল ইসলাম জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিনদিন তার পুরনো রূপে ফিরে আসছে। যেখানে মহাসড়কের ব্যবস্থাপনা, সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে আগের ভুল থেকে শিক্ষা নেবে, সেখানে বরং এসব ক্ষেত্রে অবনতি হচ্ছে। যখনই বড় কোনো ছুটি পড়ে তখনই এসব সড়ক ও ব্রিজের মেরামতের কথা মনে পড়ে। আর ভোগান্তি দেয় হাজার হাজার যাত্রীকে। আজকে আমার অতিরিক্ত ৮ ঘণ্টাসহ যাত্রাপথে আটকে থাকা যাত্রীদের ক্ষতিগ্রস্ত এই সময়ের মূল্য কে দিবে?

সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে হৃদরোগে আক্রান্ত এক রোগীকে নিয়ে। স্বজনেরা শুক্রবার রাত ৮টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। রাত ১১টার দিকে দাউদকান্দিতে পৌঁছালেও যানজটে আর এগোতে পারেনি অ্যাম্বুলেন্স। প্রায় চার ঘণ্টা আটকে থাকার পর রাত ৩টার দিকে রোগী মারা যান।

যানজটে দীর্ঘ সময় আটকে রয়েছে বিপুলসংখ্যক ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইম মুভার। ফলে শাকসবজি, ফলমূলসহ পচনশীল পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল, রপ্তানিপণ্য ও জরুরি পণ্য সময়মতো চট্টগ্রাম বন্দর বা ঢাকায় পৌঁছাতে না পারায় ব্যবসায়ীদের লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে।

পরিবহন মালিকদের হিসাবে, ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যবাহী যানবাহনের সংখ্যা ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। প্রতি গাড়িতে ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা সরাসরি পরিবহন-সংশ্লিষ্ট ক্ষতি ধরলে ৫ হাজার গাড়িতে ৫ কোটি, ১০ হাজারে ১০ কোটি, ১৫ হাজারে ১৫ কোটি এবং ২০ হাজার গাড়িতে ২০ কোটি টাকা ক্ষতি দাঁড়ায়।

তবে এই টাকা চূড়ান্ত ক্ষতির হিসাব নয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার গুডস ট্রান্সপোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ। প্রকৃত ক্ষতির মধ্যে অতিরিক্ত জ্বালানি, চালক-হেলপারের মজুরি ও ভাতা, ট্রিপ বাতিল বা বিলম্ব, গাড়ির পরিচালন ব্যয়, পণ্য সরবরাহে বিলম্ব এবং বন্দর ও অফডকে অতিরিক্ত বিলম্ব মাশুলও যুক্ত হবে।

বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার গুডস ট্রান্সপোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি কফিল উদ্দিন আহমেদ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবহন মালিকদের জন্য সরকারি উদ্যোগ দাবি করেছেন।

তাদের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যবাহী যানবাহনের সংখ্যা ও প্রকৃত ক্ষতি জরিপের মাধ্যমে দ্রুত নিরূপণ করতে হবে, প্রাথমিক হিসাবে প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির জন্য ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং চট্টগ্রাম বন্দর ও সরবরাহ চেইনে সৃষ্ট পরোক্ষ ক্ষতিও পৃথকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

কফিল উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের প্রধান অর্থনৈতিক করিডোর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সংস্কারকাজের আগে যানবাহনের চাপ বিবেচনা, বিকল্প চলাচল ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে এমন অচলাবস্থা আরও বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর