নভেম্বরের মধ্যে কৌশলগত সংলাপে বসছে বাংলাদেশ-চীন

নভেম্বরের মধ্যে কৌশলগত সংলাপে বসছে বাংলাদেশ-চীন
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

কৌশলগত সহযোগিতা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা নিয়ে একটি নতুন ‘২+২’ সংলাপ প্রক্রিয়া চালু করতে প্রস্তুত হচ্ছে ঢাকা ও বেইজিং। আগামী নভেম্বরের মধ্যেই এই সংলাপ শুরু হতে পারে।

প্রথম বৈঠকটি প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে পারেন।

গত জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে দুই দেশ কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক একটি সংলাপ প্রক্রিয়া চালু করার বিষয়ে সম্মত হয় এবং চলতি বছরই তা শুরু করার উদ্যোগ নেয়।

প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির রোববার সাংবাদিকদের জানান, এই সংলাপে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি চলছে।

তিনি বলেন, ২+২ সংলাপ হচ্ছে চীনের সঙ্গে অন্যতম সর্বোচ্চ স্তরের কৌশলগত সহযোগিতা। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যখন এই পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন ২+২ পদ্ধতির মতো উদ্যোগের পাশাপাশি চীন যে যৌথ অংশীদারত্ব পদ্ধতির চর্চা করে, তা স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার টেবিলে চলে আসে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দৃঢ় অবস্থান থেকেই এতে অংশ নেব। পরবর্তী আলোচনার উদ্দেশ্যে ২+২ প্রক্রিয়ার ভিত্তি বর্তমানে প্রস্তুত করা হচ্ছে। তাই বলা যায়, নিকট ভবিষ্যতে সুবিধাজনক সময়ে এটি শুরু হবে।’

হুমায়ুন কবির বলেন, চীন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার। ঢাকা এই নতুন প্ল্যাটফর্মটিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করবে।

টেবিলে বেশ কিছু উদ্যোগ

প্রস্তাবিত ২+২ সংলাপটি জুনে তারেক রহমানের চীন সফরের পর প্রকাশিত যৌথ ঘোষণা বাস্তবায়নে ঢাকা ও বেইজিংয়ের নেওয়া বিস্তৃত প্রচেষ্টারই একটি অংশ।

উভয় পক্ষ যত দ্রুত সম্ভব মন্ত্রী পর্যায়ের একটি কৌশলগত সংলাপ আয়োজনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সম্ভাব্যতার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রতিবেদনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ও চীন সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ (বিসিএম) অর্থনৈতিক করিডোর উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করার একটি উপায় খুঁজে বের করতেও সম্মত হয়েছে দুই দেশ। চীনা নেতৃত্ব এই প্রকল্পটিতে তাদের বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণ প্রস্তাবের জন্য একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিগগিরই এর ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে, বাংলাদেশে ইতিমধ্যে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছে। চীনা উদ্যোক্তারা আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সেখানে কারখানায় বিনিয়োগ শুরু করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

শেষের পথে তিস্তা সমীক্ষা

তিস্তা নদী প্রকল্পে চীনকে দিয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালানোর জন্য ২০১৯ সালে প্রাথমিকভাবে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল ঢাকা ও বেইজিং। এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে হস্তান্তর করার কথা ছিল।

পরবর্তীতে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার সমীক্ষার কাজ বন্ধ করতে বলায় এই প্রক্রিয়াটি থেমে যায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চীন সফর করেন। এ সময় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করার বিষয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে সমীক্ষাটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে বাংলাদেশ ও চীন আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।

জুন মাসে তারেক রহমানের চীন সফরকালেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বেইজিং তিস্তা প্রকল্পের জন্য তাদের সামর্থ্যের মধ্যে সহায়তা দিতে এবং উভয় দেশের বিশেষজ্ঞদের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট কাজ ত্বরান্বিত করতে সহায়তার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর উভয় পক্ষ পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। আলোচনার মাধ্যমেই এ খাতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয়টি নির্ধারিত হবে।

আঞ্চলিক যোগাযোগে জোর বেইজিংয়ের

বাংলাদেশ-চীনের ক্রমবর্ধমান অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে আঞ্চলিক যোগাযোগের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আঞ্চলিক যোগাযোগের উন্নয়নে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যেখানে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরটিকে বেইজিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তারেক রহমানের চীন সফরের পর দেওয়া যৌথ ঘোষণায় বিসিএম করিডোরের কথা উল্লেখ না থাকলেও, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক নিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে এর উল্লেখ ছিল।

রোববার চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন যখন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তখনো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।

আরও উচ্চপর্যায়ের সফরের পরিকল্পনা

বৈঠককালে রাষ্ট্রদূত ইয়াও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে দুই দেশের মধ্যে আগামী দিনের উচ্চপর্যায়ের পারস্পরিক আদান-প্রদান ও সফরের কথা জানান।

এর মধ্যে রয়েছে চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন এজেন্সির (সিআইডিসিএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট, কম্যুনিস্ট পার্টি অব চায়না সেন্ট্রাল কমিটির (আইডিপিসি) ইন্টারন্যাশনাল ডিপার্টমেন্টের মিনিস্টার এবং ইউনান প্রদেশের এক্সিকিউটিভ ভাইস গভর্নরের পরিকল্পিত বাংলাদেশ সফর।

এ ছাড়া, রাষ্ট্রদূত ইয়াও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকেও আগামী অক্টোবরে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান।

এই সফরগুলো জুনে তারেক রহমানের সফরে হওয়া চুক্তিগুলোর বাস্তবায়নে বাড়তি গতি আনবে এবং কূটনীতি, প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঢাকা ও বেইজিংয়ের সম্পর্ককে আরও গভীর করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর