তিন দিনে ২৫ ঘণ্টা লোডশেডিং

তিন দিনে ২৫ ঘণ্টা লোডশেডিং
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

মাঠে কাজ শেষে দুপুরে বাড়ি ফিরেছেন আমিরুল ইসলাম। প্রচণ্ড গরমে শরীর ঘামে ভেজা। বাড়িতে এসে ফ্যানের নিচে বসবেন, ঠান্ডা পানি খাবেন। কিন্তু ঘরে ঢুকেই দেখলেন লোডশেডিং। গোসলের পানি তুলতে মোটরও চলছে না। কখন বিদ্যুৎ আসবে, তাও নিশ্চিত নয়।

আমিরুল বলেন, ‘ঠিকমতো আলো পাচ্ছি না, ফ্যান চালাতে পারছি না। অথচ মাসের শেষে মিটারে ভূতুড়ে অতিরিক্ত বিল উঠে আসছে। এটা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি অত্যাচার।’

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বড় ধোপাদী গ্রামে তিন দিনের অবস্থানে লোডশেডিংয়ের এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের সময় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিন দিনে মোট ২৫ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। দিনের পাশাপাশি সন্ধ্যা ও গভীর রাতেও কয়েক দফা বিদ্যুৎ ছিল না।

মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গাছ কাটা ও নতুন লাইনের তার সংযোগের কাজের কারণে ওই সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। রাতে আরও প্রায় চার ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। সব মিলিয়ে মঙ্গলবার প্রায় ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না।

বুধবার ও বৃহস্পতিবার সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা, রাত ও গভীর রাত মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ১৫ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, কখন বিদ্যুৎ আসবে, তা আগে থেকে জানা যায় না।

লোডশেডিংয়ের বড় অংশ হচ্ছে দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা ও রাতে। এসব সময়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, পরিবারের রান্না ও দোকানপাটের বেচাকেনা চলে। এতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষক জাহিদুর রহমান বলেন, ‘দুপুর ও বিকালে ব্যাচের পড়া শুরুর সময়ই প্রায়ই লোডশেডিং শুরু হয়। টানা দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে শিক্ষার্থীরা মনোযোগ হারায়। অনেকে অসুস্থও বোধ করে।’

আরও পড়ুন

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া সুলতানার সামনে এসএসসি পরীক্ষা। সে বলে, ‘দিন-রাত মিলিয়ে আট থেকে সাড়ে আট ঘণ্টা লোডশেডিং হলে কীভাবে প্রিপারেশন নেব? রাতে পড়তে বসলেই লোডশেডিং শুরু হয়।’

সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী লিজা খাতুন বলে, ‘চার্জার লাইটের চার্জ শেষ হয়ে গেলে অন্ধকারে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।’

গ্রামের অনেক পরিবার পানি তুলতে বৈদ্যুতিক মোটরের ওপর নির্ভরশীল। লোডশেডিংয়ে তারাও ভোগান্তিতে পড়ছেন।

গৃহিণী কাজল বেগম বলেন, ‘দুপুর আর সন্ধ্যার রান্নার আগে পানি তুলতে না পারলে পুরো সংসারের কাজ আটকে যায়। যখন এক-দুই ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ আসে, তখন একসঙ্গে পানির মোটর চালানো, মোবাইল চার্জ দেওয়া ও অন্যান্য ঘরের কাজ সামলাতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠে যায়।’

রাজমিস্ত্রি মনির হোসেন বলেন, ‘সারাদিন রোদ-গরমে রড-সিমেন্টের কাজ করে শরীরে এতটুকু শক্তি থাকে না। রাতে বাড়ি ফিরে শান্তিতে দুটো ঘুমানোর উপায়ও কেড়ে নিয়েছে এই লোডশেডিং। গভীর রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে গেলে গরমে বাচ্চাদের কান্না আর মশার অত্যাচারে চোখ এক ফোঁটাও এক করা যায় না। পরদিন ক্লান্তি নিয়ে কাজ করতে হয়।’

প্রবীণ জহুরা বেগম বলেন, ‘গরমে ঘুমাতে পারি না। বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় জেগে থাকতে হয়।’

লোডশেডিংয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিদ্যুৎনির্ভর পেশার মানুষও।

অটোভ্যানচালক ইউসুফ হোসেন বলেন, ‘সারাদিন ভ্যান চালিয়ে রাতে ব্যাটারি চার্জে দিতে হয়। কিন্তু রাত দেড়টা-দুইটা বাজলেও বিদ্যুতের দেখা মেলে না। তাহলে চার্জ দেব কীভাবে? চার্জ না দিতে পারলে পরের দিন আমাদের রুজি-রুটি বন্ধ হয়ে যায়।’

ইলেকট্রনিক মিস্ত্রি সজীব হোসেন বলেন, ‘দোকানে কাজ জমে থাকে। খাটুনি কমে গেছে, আয়-রোজগার অর্ধেক হয়ে গেছে। গ্রাহকেরা এসে তাগাদা দেন, কিন্তু আমি তো নিরুপায়।’

মুদি দোকানি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘সন্ধ্যার পর লোডশেডিং হলে ক্রেতারা দোকানে ঢুকতে চায় না। ফ্রিজে রাখা দুধ, কোল্ড ড্রিংকস ও আইসক্রিম গলে নষ্ট হওয়ার উপক্রম। ব্যবসা চালানো এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

ঝিনাইদহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক (কারিগরি) রবিউল ইসলাম বলেন, ‘পুরো জেলার বিদ্যুৎ পরিস্থিতি জাতীয় পর্যায়ের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

এই চিত্র শুধু ঝিনাইদহের নয়। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মনিরাম গ্রামে নিজের বাড়িতে গিয়ে একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘গ্রামে বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে, এমন কথা নিজে এসে অভিজ্ঞতা পেলাম। গত ২৪ ঘণ্টায় বিদ্যুৎ থেকেছে খুবই কম। গোটা সন্ধ্যা বিদ্যুৎ নাই। এরপর রাত সাড়ে ১০টায় বিদ্যুৎ এসে একটানা থাকেনি। এসেছে, গেছে; এরকম চলেছে। ভোরে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর তা এসেছে সকাল সাড়ে ১১টায়।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর