সারা দেশ যখন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত, তখন অনেকটা চুপিসারে সম্প্রচার নীতিমালার অধ্যাদেশ জারি করার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিশেষজ্ঞ ও সম্প্রচার গণমাধ্যমের সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই তৈরি হয়েছে ‘সম্প্রচার অধ্যাদেশ ২০২৬’-এর খসড়া। শিগগিরই উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদন নিয়ে এই অধ্যাদেশ জারির পরিকল্পনা নেওয়ায় এটি ক্ষমতা কুক্ষিগত করার রাষ্ট্রীয় কৌশল কি না এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।
গত ২৮ জানুয়ারি সকালে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইটে এই খসড়া অধ্যাদেশটি প্রকাশ করে। জনমত যাচাইয়ের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় মাত্র ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। অর্থাৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিলের ওপর মতামতের জন্য মাত্র চার দিন সময় দেওয়া হয়েছে। অথচ দেশের পুরো গণমাধ্যম কাঠামোকে নতুন রূপ দিতে পারে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করতে পারে এই আইন।
এই খসড়া অধ্যাদেশটি সরাসরি বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ চিন্তা, বিবেক, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে গ্যারান্টি দেয়।
সংবিধান জনশৃঙ্খলা বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের অনুমতি দিলেও এই অধ্যাদেশটি তার বিপরীত। এতে ‘জনস্বার্থ বিরোধী’, ‘বিদ্বেষমূলক’ এবং ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’র মতো অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এই অস্পষ্টতার কারণে যেকোনো সমালোচনামূলক বিষয়কে সহজেই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের আলোকে দেখলে এই সংকট আরও গভীর। সংবিধানের এই অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভ এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে। কিন্তু এই অধ্যাদেশে টেলিভিশন-রেডিও’র লাইসেন্স স্থগিত ও বাতিলের ধারাগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই কোনো গণমাধ্যমের অস্তিত্ব ধ্বংস করে দিতে পারে।
এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ক্ষতিপূরণ দাবির অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে; আদালতে যাওয়ার সুযোগও সীমিত করা হয়েছে। এটি সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকার রক্ষা করার নিশ্চয়তার সরাসরি পরিপন্থী।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা মনে করেন, মাত্র চার দিনের নোটিশে এমন স্পর্শকাতর অধ্যাদেশ আনা কোনো প্রশাসনিক জরুরি বিষয় নয়। বরং এটি গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার একটি পুরোনো রাষ্ট্রীয় কৌশলের নতুন রূপ।
খসড়া তৈরিতে কোনো গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ, গবেষক বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যুক্ত না করায় মন্ত্রণালয়ের অবহেলা স্পষ্ট হয়েছে। ইউল্যাবের মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষক দীন এম সুমন রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান শেখ আদনান ফাহাদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. মফিজুর রহমানও জানিয়েছেন, খসড়া তৈরিতে গবেষকদের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না।
অধ্যাদেশটি আনার সময়টিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। সারা দেশের মানুষ যখন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত, তখন অনেকটা চুপচাপ এটি প্রকাশ করা হয়েছে। অনেক নাগরিক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মতামত দেওয়ার বিষয়টি জানেনই না। কারণ, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রচার চালানো হয়নি।
এই বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব খাদিজা তাহেরা ববি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সীমিত। এই কারণেই চার দিনের মধ্যে মতামত সংগ্রহ করা হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম পদত্যাগ করার পর গত ১১ ডিসেম্বর সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে বারবার চেষ্টা করেও এই অধ্যাদেশ নিয়ে তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আলোচনা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে সম্প্রচার অধ্যাদেশ জারির উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের (বিজেসি) চেয়ারম্যান রেজওয়ানুল হক।
তিনি বলেন, ‘২৮ তারিখে খসড়া প্রকাশ করে ৩১ তারিখের মধ্যে মতামত চাওয়া অত্যন্ত তড়িঘড়ি করা একটি প্রক্রিয়া। এমন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে কোনো টেকসই ফলাফল আসা সম্ভব নয়।’
সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের উপেক্ষা করা অগ্রহণযোগ্য বলে মত দিয়ে বর্তমান নির্বাচনী সময়ে অধ্যাদেশটি স্থগিত রাখার আহ্বান জানান রেজওয়ানুল হক। তার মতে, নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এটি নিয়ে কাজ করাই হবে যুক্তিসংগত পথ।


