চায়না দুয়ারি জালে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছ, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

চায়না দুয়ারি জালে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছ, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য
গুটিয়ে রাখা চায়না দুয়ারী জাল। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

দেশীয় মাছের অবারিত উৎস খাল-বিল, নদ-নদী আর বিভিন্ন জলাশয়। এসব উৎস গুলোতে এখন পেতে রাখা হচ্ছে মাছের জন্য মরণফাঁদ, নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জাল। বাংলাদেশের দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার প্রতিটি কোণে এই জালের বিস্তার এমন এক উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে যে, এর থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোনো জলজ প্রাণী। নির্বিচারে এই জাল ব্যবহারের ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছ আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে, আর মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে গোটা জলজ জীববৈচিত্র্য।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে এই ক্ষতিকর জালের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলেও, তাতে স্থায়ী কোনো ফল মিলছে না। অভিযান শেষ হতে না হতেই অসাধু চক্র ফের নতুন জাল কিনে খাল-বিলে পেতে রাখছে। তাই সচেতন মহলের মতে, শুধু মাঠপর্যায়ের ব্যবহারকারীদের ধরে জরিমানা বা অভিযান চালিয়ে এর প্রতিকার সম্ভব নয়। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য এই জাল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের কারখানাগুলো চিরতরে বন্ধ করতে হবে।

জাতীয় পর্যায়ে পরিবেশ, মৎস্য ও জলজ প্রাণির জন্য ক্ষতিকর এই নিষিদ্ধ জালের বিস্তার দেশের অন্যান্য এলাকার মতো নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়াতেও ব্যাপক আকারে বিস্তার লাভ করেছে। হাতিয়া পৌরসভাসহ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নেই এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি হাতিয়া পৌরসভা ও বুড়িরচর ইউনিয়নসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, হাঁটুপানি থেকে শুরু করে গভীর জলেও দুষ্টচক্র চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে মাছ শিকার করছে। জালের ফাঁস অত্যন্ত সূক্ষ্ম হওয়ায় এতে ছোট-বড় সব ধরনের মাছের পাশাপাশি ডিম, রেণু ও পোনাও আটকা পড়ছে। একই সঙ্গে শামুক, ব্যাঙ, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীও এর শিকার হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের কার্যকর ও নিয়মিত অভিযান না থাকায় দিন দিন এই জালের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

আরও পড়ুন

হাতিয়া পৌরসভার শূন্যেরচর গ্রামের আবু সাহেদ বলেন, ‘এখানকার এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে চায়না দুয়ারি জাল বসানো হয় না। বিত্তশালী থেকে শুরু করে নারীরাও বিলে এই জাল বসিয়ে মাছ ধরছেন।’

কামাল নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘একসময় বর্ষা মৌসুমে আশপাশের জলাশয়ে প্রচুর শোল, বোয়াল, কৈ, শিংসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারীসহ নানা ধরনের জালের কারণে মাছ বড় হওয়ার আগেই ধরা পড়ে যাচ্ছে এসব মাছ।’

নিঝুম দ্বীপ এলাকার সোলেমান মাঝি বলেন, ‘সরকারিভাবে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল উৎপাদনের কারখানা বন্ধ না করে, শুধু মাঝে-মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে কোনো লাভ হবে না। উৎপাদনস্থল বন্ধ করতে হবে।’

উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হাতিয়ার খাল-নালা ও জলাশয়ে মোট মাছ উৎপাদন ও আহরণের পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার মেট্রিক টন। তবে গত অর্থবছর এবং চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার জরিপ প্রতিবেদন এখনো প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি বলে জানানো হয়েছে।

হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফয়জুর রহমান জানান, চায়না দুয়ারি জাল উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসন, কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের সহায়তায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ওছখালী, আফাজিয়া বাজার ও তমরুদ্দিন লঞ্চঘাট থেকে চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করে বিনষ্ট করা হয়েছে। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল জানান, নিষিদ্ধ ঘোষিত চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। নিষিদ্ধ এই জালের সন্ধান যেখানে পাওয়া যাবে- সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর