কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ মাছ ধরার জালের ব্যাপক ব্যবহার দেশীয় প্রজাতির মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও জেলেরা প্রকাশ্যে এই জাল ব্যবহার করছেন।
কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে এই ধরনের জাল জব্দ করলেও হাওর অঞ্চলের খাল, বিল, নদী ও অন্যান্য জলাশয়ে এর ব্যবহার চলছেই। স্থানীয় বাসিন্দা এবং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে দেশীয় মাছের সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল।
জেলে ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত চার-পাঁচ বছরে হাওরে ধরা পড়া মাছের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানের মাছ পাওয়ার পরিমাণ আগের তুলনায় চার ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। মাছ কমে যাওয়ার জন্য অনেকেই এই অবৈধ জালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারকে দায়ী করছেন।
স্থানীয়ভাবে ‘চায়না জাল’, ‘ম্যাজিক জাল’ বা ‘রিং জাল’ নামে পরিচিত এই মাছ ধরার সরঞ্জামটি নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বাজারে ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়। জেলেরা জানান, এই জাল এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে একবার মাছ এর ভেতরে ঢুকলে আর বের হতে পারে না।
আকার ও গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি জালের দাম চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। কোনো কোনো জাল হাতের মাপেও বিক্রি হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, একটি ৪০ হাত জালের দাম প্রায় চার হাজার টাকা।
এই জালের সুতা বা ঘর অত্যন্ত সূক্ষ্ম হওয়ায় এতে কেবল বড় মাছই নয়, বরং পোনা মাছ, জলজ চুনোপুঁটি এবং এমনকি প্লাঙ্কটনও আটকে যায়। ফলে মাছের প্রজনন চক্র ব্যাহত হয় এবং সামগ্রিক জলজ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হচ্ছে।
হাওর এলাকার বিভিন্ন স্থান ঘুরে এই ধরনের জালের ব্যবহার বাড়ার চিত্র দেখা গেছে। জেলেরা জানান, কম পরিশ্রমে বেশি মাছ ধরা যায় বলেই এই জাল এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
মিঠামইন উপজেলার কেওয়ারজোর গ্রামের কামরুল ইসলাম নামের এক জেলে বলেন, ঝাঁকি জালের তুলনায় এই জালে প্রায় দ্বিগুণ মাছ পাওয়া যায়।
ইটনা উপজেলার আরেক জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই জাল এখন প্রায় সব স্থানীয় বাজারেই পাওয়া যায়। তবে এগুলো চোখের আড়ালে রাখা হয়, দরদাম ঠিক হওয়ার পর গোপনে বিক্রি করা হয়।
নিকলী উপজেলার গুরুই গ্রামের জেলে শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রশাসনের অভিযান সাধারণত দরিদ্র জেলেদের লক্ষ্য করে চালানো হয়। কিন্তু যারা এই জাল তৈরি ও বিক্রি করে তারা ছাড় পেয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বেঁচে থাকার জন্য মাছ ধরি। যে জালে বেশি মাছ পাওয়া যায়, আমরা সেটাই কিনি।’ তবে এই জাল যে মাছের বংশ নষ্ট করছে, তাও তিনি স্বীকার করেন।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাছ ধরার জালের ফাঁসের সর্বনিম্ন আকার সাড়ে চার সেন্টিমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। এই আকারের চেয়ে ছোট ফাঁসের জালকে অবৈধ বলে গণ্য করা হয়। কর্মকর্তারা জানান, চায়না দুয়ারী জাল কারেন্ট জালের মতোই এই নিষিদ্ধ ক্যাটাগরির মধ্যে পড়ে।
নিকলী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মোহাইমেনুল ইসলাম জানান, এই জাল ফাঁসের আকারের নিয়ম লঙ্ঘন করায় এগুলো অবৈধ। তবে বাস্তবে এগুলো এখনো সব জায়গায় সহজলভ্য।
কিশোরগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, বর্ষাকালে যখন হাওরের পানি বাড়ে এবং মাছ ধরার তৎপরতা বৃদ্ধি পায়, তখন এই অবৈধ জালের ব্যবহার বেড়ে যায়। তিনি জানান, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই জালের ব্যবহার অব্যাহত থাকলে বেশ কিছু দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে চলে যেতে পারে।
কিশোরগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক এবং সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম পৌর মহিলা কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হলে তা জলজ উদ্ভিদ এবং সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্যের ওপরও প্রভাব ফেলবে।
তিনি কেবল এই জালের ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে নয়, বরং অবৈধ এই জালের উৎপাদন, বিপণন এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, তা না হলে অনেক দেশীয় প্রজাতির মাছ হয়তো কেবল খাতা-কলমেই টিকে থাকবে।
হাওরের জীববৈচিত্র্য এবং মৎস্য সম্পদ রক্ষায় কর্তৃপক্ষ এবং পরিবেশবাদী উভয় পক্ষই আইনের আরও কঠোর প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন।


