রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পাঁচ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, অনির্দিষ্টকাল ধরে এই দায়িত্ব কেবল বাংলাদেশ একা বহন করবে—এমন প্রত্যাশা করা যায় না।
বুধবার নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বিপুল চাপ তৈরি হয়েছে। অথচ একদিকে চাহিদা বাড়লেও আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার জীবনরেখা সংকুচিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের আবেদনের বিপরীতে ২০২৬ সালে তা কমিয়ে ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। মানবিক সহায়তার এই ঘাটতি রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না।

প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, এই সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং সমাধানও সেখানে নিহিত। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সহিংসতায় রাখাইনের পরিস্থিতি এখনো গভীরভাবে উদ্বেগজনক। নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তী সময়ে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘অতীতে তাদের দূরদর্শী নেতৃত্বেই সফলভাবে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালের সহিংসতার পর এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মানবিকতার তাগিদে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়েছিল।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেন। তা হলো-
১ম রোডম্যাপ প্রণয়ন: দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
২য় সহিংসতা বন্ধ: রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং নিজভূমিতে তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৩য় পর্যাপ্ত সহায়তা: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

৪র্থ ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি: টেকসই প্রত্যাবাসনের স্বার্থে আইসিজে ও আইসিসি-সহ আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্তব্যবস্থাগুলোকে অব্যাহত সহায়তা দিতে হবে এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
৫ম আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন: মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিকতার সঙ্গে বাংলাদেশ তার দায়িত্ব পালন করেছে। এবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং এই বাস্তুচ্যুতির গল্পের অবসান ঘটিয়ে ন্যায়বিচার ও আশার সূচনা করতে হবে এখনই।
প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে সাধারণ বিতর্কে এটি হবে তার প্রথম ভাষণ।


