মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)-এর হাতে আটক থাকা ১৮ জেলে তিন দিন পর দেশে ফিরেছেন। মঙ্গলবার বিকালে মিয়ানমারের মংডু শহরের নাইক্ষ্যংদিয়ায় অবস্থিত একটি ঘাঁটি থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে তারা শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিম পাড়া নৌঘাট ও সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন এলাকায় ফিরে আসেন।
ফিরে আসা জেলেরা সবাই শাহপরীর দ্বীপের মাঝের পাড়া ও ডাঙ্গর পাড়া এলাকার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে রয়েছেন— মোস্তাফিজুর রহমান (৪০), ফরিদ হোসেন (৩০), রবিউল হাসান (১৭), আবুল কালাম (৩০), মীর কাশেম আলী (৪০), গিয়াস উদ্দিন (২৫), সালাউদ্দিন (১৮), মহিউদ্দিন (২২), হোসেন আহম্মদ (৩৮), মলা কালু মিয়া (৫৫), আবু তাহের (৪০), আবদুল খালেক, জাবের মিয়া (২৪) ও রহিম উল্লাহ (২০)।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের সেন্টমার্টিন এলাকা থেকে মাছ শিকার শেষে ফেরার পথে শাহপরীর দ্বীপ সংলগ্ন নাফ নদীর নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকায় তিনটি মাছ ধরার নৌকাসহ ১৪ জন জেলেকে আটক করে আরাকান আর্মি।
জেলেদের দাবি, জোয়ার-ভাটার প্রবল স্রোতে দিকভ্রান্ত হয়ে তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে মিয়ানমারের জলসীমায় প্রবেশ করেছিলেন। আরাকান আর্মিরা ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের উপর নির্যাতন চালায়।
ফেরত আসা জেলে সালাউদ্দিন বলেন, ‘জোয়ার-ভাটার স্রোতে আমরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। বুঝতে না পেরে মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে যাই। তখন আরাকান আর্মির সদস্যরা আমাদের আটক করে নিয়ে যায় এবং হেফাজতে রেখে নির্যাতন চালায়।’
আরেক জেলে মহিউদ্দিন বলেন, ‘তিন দিন আমাদের আটক করে রাখা হয়। ছেড়ে দেওয়ার আগে তারা বাংলাদেশি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু কোনো যোগাযোগ না হওয়ায় আমাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।’
এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটি সম্পর্কে তারা শুরু থেকেই অবগত ছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে জেলেদের নিরাপদে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইনামুল হাফিজ নাদিম বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকায় এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত। ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।’
নাফ নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের সতর্ক থাকার জন্য তারা নিয়মিত নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
নাফ নদী ও সাগরঘেঁষা কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপ। এই জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকা নদী ও সাগরের ওপর নির্ভরশীল। সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলে এসব মানুষই জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঝুঁকি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটায়। সাম্প্রতিক সময়ে ১৪ জেলে অপহরণের ঘটনা এই জনপদের জেলেদের জীবন নিয়ে দীর্ঘদিনের সেই ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতাকেই আবারও সামনে এনে দিয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। বিজিবি ও স্থানীয় জেলে সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে অন্তত ৪ শতাধিক জেলেকে বিভিন্ন সময়ে সীমান্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। এর মধ্যে প্রায় ২৫০ জেলেকে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ৭৩ জেলে দেশে ফিরে আসেন।
বিজিবির প্রচেষ্টায় কয়েক দফায় ১৮৯ জন জেলে এবং ২৭টি ট্রলার উদ্ধার করা গেলেও এখনো ৩২টি ট্রলার ও ১৭২ জন জেলে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কারাগারে আটক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে আটক হওয়া আরও বহু জেলে এখনো আরাকান আর্মির কাছে বন্দি থাকতে পারেন, যা নিয়ে স্থানীয় জেলেপল্লীগুলোতে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের দাবি, ‘সাগরে নিরাপদে মাছ ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলে জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঝুঁকি কমাতে টেকসই সমাধান এখন সময়ের দাবি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


