প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনা বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বলে মনে করছে আল-জাজিরা।
গত ১৮ ডিসেম্বর তরুণ ছাত্রনেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় প্রথম সারির দুই সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ চালায় দুষ্কৃতিকারীরা। পুড়িয়ে দেওয়া হয় প্রথম আলোর একটি ভবন ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়। পাশের একটি ভবন থেকে আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পান প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক গালিব আশরাফ।
সে সময় বাইরে জড়ো হওয়া জনতা সংবাদমাধ্যম দুটিকে বিশ্বাসঘাতক বলে অভিযুক্ত করছিল। বিক্ষোভকারীরা এই দুটি পত্রিকাকে সাবেক শেখ হাসিনা সরকারের সহযোগী এবং ‘দিল্লির দালাল’ আখ্যা দেয়। তবে উভয়েই এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এই হামলাকে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সংবাদমাধ্যমের ওপর সংঘটিত সবচেয়ে গুরুতর আক্রমণগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বুধবার আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন সাংবাদিকরা দেখছেন- প্রাতিষ্ঠানিক দমন-পীড়নের জায়গা নিয়েছে জনগণের ক্ষোভ। পক্ষপাতিত্ব, নানাখাতে সংবাদমাধ্যমের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে জনগণের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছেন সাংবাদিকরা, যা তাদের নির্বিঘ্ন কাজের ক্ষেত্রে প্রধান হুমকি হয়ে উঠেছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে সাংবাদিকরা প্রবল চাপের মুখে থাকলেও ঝুঁকিগুলো অনেকটা আগে থেকেই অনুমান করা যেতো। নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসান বলেন, ‘সাবেক সরকারের ছিল “যৌক্তিক আচরণ” যার সীমারেখা ছিল স্পষ্ট।’ সাংবাদিকরা তখন জানতেন, প্রধানমন্ত্রীর পরিবার নিয়ে অনুসন্ধান বা তার সমালোচনা করলে নজরদারি, কারাবরণ কিংবা সরকারি বিজ্ঞাপন প্রত্যাহারের মতো পরিণতি হতে পারে।
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং পরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর এই ঝুঁকির ধরন বদলে যায়।
নাজমুল আহসান অন্তর্বর্তী সরকারের এই সময়কে ‘জনগণের সহিংসতার যুগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যেখানে জনগণ ঠিক করে দিচ্ছে কোন প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়। এসব গোষ্ঠীর অনিশ্চিত আচরণ সংবাদকক্ষের জন্য ঝুঁকি নিরূপণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
শেখ হাসিনা-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার কাঠামো বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এতে নতুন নতুন অংশীজনও যুক্ত হয়েছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এম আবুল কালাম আজাদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গণমাধ্যমের বিকাশ ঘটার কথা থাকলেও বাস্তবে এটি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে গণমাধ্যম পরিবেশে প্রভাব ফেলছে ২০২৪ সালের আন্দোলনের ছাত্রনেতারা, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল এবং ক্রমবর্ধমান ডানপন্থী ও ইসলামপন্থী শক্তি।
ডিসেম্বরের সহিংসতার সময় রাষ্ট্রপক্ষের (সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী) ভূমিকা নিয়েও সাংবাদিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হামলার আগেই জনগণ সংবাদপত্র কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়ার ঘোষণা দিলেও নিরাপত্তা বাহিনী ভাঙচুর ঠেকাতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রথম আলোর এক সাংবাদিক জানান, ভবনে আগুন লাগার সময় তিনি একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাকে ফোন করে সহায়তা চান। ওই কর্মকর্তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়েছেন বলে দাবি করলেও পুলিশ প্রায় ৪০ মিনিট পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং তখনও নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল।
মিডিয়া পাড়ার ভেতর থেকেই অভিযোগ উঠেছে- সরকারের কিছু অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে নিরাপত্তা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে দেয়নি।
শারীরিক সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় সাংবাদিকদের প্রকাশ্য আচরণেও বড় পরিবর্তন এসেছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদক তানজিলা তাসনিম জানান, জনগণের ক্ষোভ ও মবের শিকার হওয়ার শঙ্কায় এখন অনেক সাংবাদিক জনসমক্ষে পরিচয়পত্র ব্যবহার করেন না।
একইভাবে গালিব আশরাফ জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি শুধু প্রথম আলোর সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার কারণেই হয়রানির শিকার হয়েছেন।
এই ভয়ের পরিবেশ ‘আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক সেন্সরশিপ’ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং সম্পাদকীয় নীতিকে আরও কঠোর করেছে।
দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক আসাদুজ্জামান বলেন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করতে গেলে এখন এমন তথ্যও নথিভুক্ত প্রমাণ ছাড়া প্রকাশ করা যায় না, যা আগে একাধিক সূত্রের ভিত্তিতে করা হতো।
এই সতর্কতার পেছনে রয়েছে জনআস্থার বড় ঘাটতি। অনেক নাগরিক মনে করেন, শেখ হাসিনা আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে মূলধারার গণমাধ্যম সঠিকভাবে প্রতিবেদন করেনি।
একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ইসলামপন্থী আবেগের কারণে উগ্রবাদ বা চরমপন্থা নিয়ে প্রতিবেদন করলেই মূলধারার গণমাধ্যমকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
একজন স্থানীয় সম্পাদক বলেন, সহিংসতাকে ক্রমেই এক ধরনের ‘মিডিয়া সমালোচনা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে সাংবাদিকদের কাজ করতে হচ্ছে চরম সতর্কতার মধ্যে।


