পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল রপ্তানিতে ইরাকের সরকারের সঙ্গে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জেরে কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালি ও হুথি বিদ্রোহীদের হামলার শঙ্কায় থাকা লোহিত সাগরের বিকল্প পথ খুঁজে পেতে এই চুক্তি হয়।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, শুক্রবার ইরাক সরকারের সঙ্গে প্রায় ছয় হাজার কোটি ডলারের চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের কার্যালয়ে সই হওয়া চুক্তিগুলোতে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ খোঁজার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।
তবে তেল পরিবহনের এসব প্রকল্প কবে নাগাদ হরমুজ প্রণালির কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাবে, যদি সমুদ্রপথে জাহাজে তেল পরিবহনের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র পাইপলাইনকে বিকল্প ধরে নেয়, তাহলে তাদের জানা উচিত একটি দেশের ভেতরেই তেলের পাইপলাইন নির্মাণে অন্তত আড়াই বছর সময় লাগে। প্রস্তাবিত পাইপলাইনগুলো দুই বা তার বেশি দেশের মধ্য দিয়ে যাবে বলে এগুলো নির্মাণে আরও বেশি সময় লাগতে পারে।
এদিকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান বারবার হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার চেষ্টা করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দামে তীব্র ওঠানামা দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার বিকালে ওয়েস্ট টেক্সাস অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় পাঁচ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ ডলারে ওঠে। যুদ্ধ শুরুর আগে এর দাম ছিল প্রায় ৬৭ ডলার।
এপ্রিলের শুরুতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরে যুদ্ধবিরতি হলে দাম কমে আসে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর আবারও দাম বেড়েছে।
তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত টমাস ব্যারাক বলেন, ‘তেল পাইপলাইনসংক্রান্ত এসব চুক্তির ফলে এমন একটি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে, যা হরমুজ প্রণালিকে গুরুত্বহীন করে তুলবে।’
চুক্তি সইয়ের আগের দিন বৃহস্পতিবার হিউস্টনে শেভরনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী ফালাহ আল-জাইদি। বৈঠকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানিটিকে ইরাকে বিনিয়োগ বাড়ানো ও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানান।
শুক্রবার এক ভাষণে আল-জাইদি বলেন, ‘ইরাকের অর্থনীতি শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব চায়।’
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ, সংলাপ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে ইরাকের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়,ম শুক্রবার ইরাক সরকারের সঙ্গে তিনটি চুক্তি সই করেছে শেভরন।
শেভরনের করপোরেট ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের সভাপতি জেক স্পিয়ারিং বলেন, চুক্তিগুলোর দুটি ইরাকে তেল উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেবে। তৃতীয় চুক্তির আওতায় একটি পাইপলাইনে বিনিয়োগ করা হবে, যা ইরাক থেকে বিশ্ববাজারে তেল রপ্তানির আরেকটি পথ তৈরি করবে। তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এই প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই দিনে ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যে ইরাক-সিরিয়া অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন পুনর্বাসন ও পুনর্নির্মাণের একটি চুক্তিকেও স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
দপ্তরটি বলেছে, অগ্রাধিকারভিত্তিক অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে ওই পাইপলাইন পুনর্গঠন এগিয়ে নিতে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, প্রকল্পটির কারিগরি ও আর্থিক দিক বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক জোটের সম্পৃক্ততাকে তারা স্বাগত জানায়।
ইরাকি কর্মকর্তাদের মতে, পাইপলাইনটি দক্ষিণ ইরাকের বসরা থেকে পশ্চিমাঞ্চলীয় হাদিথা পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে পাইপলাইনের একটি অংশ তুরস্কের জেইহান বন্দর এবং অন্য অংশ সিরিয়ার উপকূলের বানিয়াস বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হবে।
এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের পরিকল্পনা রয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকেরা বলেছেন, ওই অঞ্চলে নির্মাণাধীন সাতটি পাইপলাইন ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা তেলের প্রায় ৬০ শতাংশ বহন করতে সক্ষম হতে পারে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, ওই সময় এসব পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব হবে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর তেলসমৃদ্ধ ইরাক সংঘাতের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে। ফলে দেশটি উভয় পক্ষের হামলায় ভুক্তভোগী হতে হয় ইরাককে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে সিরিয়া এখন পর্যন্ত এই সংঘাত থেকে অনেকটাই দূরে থাকতে পেরেছে।
নিজেদের ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধের পরিণতি এখনো সামাল দিতে থাকা সিরিয়া নিজেকে অঞ্চলটির স্থিতিশীলতার কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরছে। জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প পথ হিসেবেও দেশটি নিজ ভূখণ্ড ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে।
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় ইরাকের কিছু তেল ট্রাকে করে সিরিয়ায় নেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে সিরিয়ার বানিয়াস বন্দর হয়ে এসব তেল ইউরোপের বাজারে পাঠানো হচ্ছে। এতে হরমুজ প্রণালির পথ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
উত্তর ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র এক দশকের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর এপ্রিলে আবার চালু করা হয়েছে। কর্মকর্তারা এটিকে জ্বালানি রপ্তানির আরেকটি বিকল্প পথ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তবে স্থলপথে ট্রাকে তেল পরিবহন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজে রপ্তানির তুলনায় কম কার্যকর ও বেশি ব্যয়বহুল।
পরিকল্পিত পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ইরাক থেকে সিরিয়া ও তুরস্কে আরও বেশি পরিমাণ তেল রপ্তানি করা সম্ভব হবে।


