১৩ নভেম্বর ঘিরে নানা ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা বাড়তে থাকায় গোটা দেশকে কড়া নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। গত কয়েকদিনে একাধিক স্থানে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের পর ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর নাগরিক জীবনে সৃষ্টি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।
গত তিন দিনে বেশ কিছু যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়েছে, বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে ককটেলের। অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এরপরই দেশজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করতে বাধ্য হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী।
এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক, বীমা, আদালত প্রাঙ্গণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাসহ প্রধান প্রধান প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোও তাদের কর্মীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কায় সব বিমানবন্দরকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং বিভাগীয় ও জেলা পুলিশ কার্যালয়গুলো শনিবার থেকে একাধিক জরুরি সমন্বয় সভা করেছে। আগাম গোয়েন্দা তথ্যের মূল্যায়নের ভিত্তিতে, সহিংসতা বা নাশকতা প্রতিরোধে দেশব্যাপী বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং ডিএমপি কমিশনার নাগরিকদের আশ্বস্ত করেছেন।
ঢাকার আবাসিক এলাকা ও বাস-ট্রেন স্টেশন এলাকায় তল্লাশি অভিযান ও নজরদারি জোরদার করেছে। আন্দোলনকারীদের আশ্রয় দেওয়ার সন্দেহে মেস, হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলোতেও গোয়েন্দা ইউনিট তল্লাশি চালাচ্ছে।
বিক্ষিপ্ত হামলার আশঙ্কায় রাজধানীতে রাতের টহল বাড়ানো হয়েছে।
শুধু গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার বিভিন্ন স্থানে চারটি বাস ও একটি প্রাইভেট কারে আগুন দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে সূত্রাপুর ফায়ার স্টেশনের সামনে অগ্নিসংযোগকারীরা একটি ‘মালঞ্চ পরিবহন’ বাসে আগুন দেয়। অন্যদিকে, সোমবার রাতে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় একটি যাত্রীবাহী কোচে আগুন দেওয়া হলে একজন চালক নিহত হন।
বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে ককটেল বিস্ফোরণের খবরও পাওয়া গেছে। এ পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার ঢাকার রাস্তাঘাট বেশ শান্ত ছিল। পথে যানবাহন ও পথচারীর সংখ্যাও ছিল অন্যান্য স্বাভাবিক দিনের চেয়ে অনেক কম ছিল।
জনগণের এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের কিছু বক্তব্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি সবাইকে বৃহস্পতিবার ঘরে থাকার, কাজে না যাওয়ার এবং রাস্তায় যানবাহন না নামানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
পুলিশ বলেছে, বিদেশ থেকে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রচারিত এই ধরনের প্রচারণা ও প্রোপাগান্ডা বাংলাদেশে তাদের কর্মীদের হামলায় উস্কানি দিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার অর্থাৎ ১৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটি মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ করবে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সন্দেহ করছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে এবং ‘ঢাকা লকডাউন কর্মসূচি’ আড়ালে সহিংসতা চালাতে পারে।
পুলিশের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঢাকা মহানগর এলাকাকে বিস্তৃত নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নেওয়া হয়েছে। মহানগরজুড়ে প্রায় ১৭ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। মোবাইল টিম ও টহল বাড়ানো হয়েছে এবং সাদা পোশাকের পুলিশি নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।
ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার পর সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে গির্জা ও মন্দিরের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ব্যাহত বা ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টির যেকোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে ডিএমপি।
পুলিশ ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকায় সব ধরনের জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে এবং নাশকতা প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। রেল স্টেশনগুলো বিশেষ নজরে রাখা হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে, সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করছে।
র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘১৩ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে আমরা সাইবার মনিটরিং, মাঠ পর্যায়ে টহল এবং গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করেছি। হুমকিটি গুজব বা বাস্তব পরিকল্পনা যা থেকেই আসুক না কেন, প্রতিটি তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হচ্ছে।’
মঙ্গলবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাতও নাগরিকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
তিনি বলেন, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক সংগঠন এবং তাদের সহযোগীরা ১৩ নভেম্বরের জন্য যে তথাকথিত কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, তা নিয়ে জনগণের আতঙ্কিত হওয়া উচিত নয়।’
কিছু দিন ধরে এই গোষ্ঠীটি আইনশৃঙ্খলা অস্থিতিশীল করতে অনলাইনে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘দলটির কর্মীরা বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় জড়ো হয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করছে।’
এই সব ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গত ১ অক্টোবর থেকে ৫৫২ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যাদের বেশিরভাগই ঢাকার বাইরের জেলা থেকে এসেছে। সাম্প্রতিক সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর সিসিটিভি ফুটেজও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
তিনি পরিচয় যাচাই না করে অপরিচিত কাউকে আশ্রয় না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকাবাসীর প্রতি। সেইসঙ্গে হোটেল ও গেস্ট-হাউস পরিচালকদের অতিথিদের গ্রহণ করার আগে জাতীয় পরিচয়পত্র পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন।
নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহন যাতে কোনো অবস্থাতেই অরক্ষিত না থাকে তা নিশ্চিত করতেও অনুরোধ করা হয়েছে।


