প্রায় ১৮ বছর পর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে ঐতিহ্যবাহী সামরিক কুচকাওয়াজ ফেরার মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে উদযাপিত হতে যাচ্ছে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। এবারের স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর ও বেসরকারি সংস্থাগুলো সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। একইসঙ্গে জননিরাপত্তা ও জনসেবা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
গত বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন ছিল সীমিত ও সংযত। রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং সংস্কার প্রক্রিয়ার কারণে তখন মহান মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছিল। এছাড়া জাতীয় স্টেডিয়ামে সংস্কার কাজ চলায় গত বছর ঢাকায় কেন্দ্রীয় কুচকাওয়াজ আয়োজন করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে জনসমাগমের জৌলুসও কিছুটা ম্লান ছিল। তবে চলতি বছর বিএনপি সরকারের অধীনে দেশব্যাপী উৎসবের আমেজ ফিরিয়ে আনার ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে নিরস্ত্র মানুষের ওপর বর্বরোচিত হামলার পর ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়। ঘোষণা করা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেই থেকে এই দিনটি স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
২০০৮ সালের পর এই প্রথম ২৬শে মার্চের আনুষ্ঠানিকতায় সামরিক কুচকাওয়াজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সকাল ৯টায় তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর এলাকায় এই কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হবে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কুচকাওয়াজে উপস্থিত থাকবেন। অনুষ্ঠানটি সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীরা সকাল ৯টা থেকে ২, ৩, ৪, ১০ ও ১১ নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এই বর্ণাঢ্য আয়োজনটি টেলিভিশন ও রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করবে।
ঢাকাসহ সারা দেশে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের শুভ সূচনা হবে। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। সাভার গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার খান অনু জানান, স্মৃতিসৌধ এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে এবং প্রচুর ফুলের চারা রোপণের পাশাপাশি লেক সংস্কার ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জোরদার করা হয়েছে বহুমুখী নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের (উত্তর) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরাফাতুল ইসলাম জানান, দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে।
বৃহস্পতিবার ২৬শে মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে সঙ্গীত পরিবেশন করবে সশস্ত্র বাহিনীর অর্কেস্ট্রা দল এবং এবছর একুশে পদকপ্রাপ্ত জনপ্রিয় ব্যান্ড ওয়ারফেজ।
উৎসবের আমেজ থাকলেও সরকারিভাবে মিতব্যয়িতা নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ঘোষণা করেছেন, জ্বালানি সংকট ও ব্যয় সাশ্রয় নীতির কারণে ২৫শে মার্চ রাত অথবা স্বাধীনতা দিবসে কোনো ভবন বা স্মৃতিস্তম্ভে আলোকসজ্জা করা হবে না।
স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে নিজস্ব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সকাল ৮টা থেকে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন, ছাত্র সমাবেশ, কুচকাওয়াজ ও ডিসপ্লে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করেছে। এছাড়া জাতীয় স্টেডিয়ামে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বড় ধরনের শিশু-কিশোর সমাবেশ আয়োজন করা হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা সেবা ও রোগীদের জন্য বিশেষ উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা করবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় শিশুসদন, বৃদ্ধাশ্রম, কারাগার ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ খাবারের আয়োজন করবে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ও বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা নিয়েছে। ধর্মীয় বিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশের উন্নতি, সমৃদ্ধি ও শান্তি কামনায় সকল উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করবে।


