মাগরিবের নামাজে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। পেছন থেকে যুবলীগ, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজন গুলি চালাতে থাকে; মুসল্লিদের পেছনের দুই কাতারে থাকা অনেকের শরীরে গুলি লাগে।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিতে গিয়ে এমন বর্ণনা দিয়েছেন প্রসিকিউশনের সাক্ষী মো. জাকির হোসেন, বয়স ৫৫। রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জবানবন্দি গ্রহণ করে।
জবানবন্দিতে জাকির হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই আন্দোলনকারী ছাত্রদের ‘রাজাকার’ বলার প্রতিবাদে পরদিন আমার দুই ছেলেসহ ছাত্র-জনতা আন্দোলনে নামি। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশের হাতে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ করেন তিনি। এর পরদিন রংপুরে আবু সাঈদ, চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ সারাদেশে ছয় আন্দোলনকারী নিহত হন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার দাবি, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ গুলি করে তাদের হত্যা করে।
১৭ জুলাই বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজাকে খুঁজতে নীলক্ষেতে যান জাকির। তার ছেলে ঢাকা কলেজের সামনে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। পরে ফোনে ছেলে তাকে জানান, তিনি বাসায় চলে গেছেন।
সেদিন ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের বিপরীতে ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কথাও জানান জাকির। তার ভাষ্য, সেখানে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশের গুলিতে বহু আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে দুজনকে তিনি পপুলার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।
আজিমপুরে গুলি
১৮ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন জাকির। চাকরিতে বৈষম্য এবং আগের দুই দিনে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন ও গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে তিনি আন্দোলনে অংশ নেন বলে জবানবন্দিতে বলেন।
দুপুর আড়াইটার দিকে বাসায় ফিরে যান তিনি। পরে বেলা ৩টার দিকে আজিমপুর মেয়র হানিফ জামে মসজিদের সামনে গিয়ে দেখেন, পুলিশ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা লীগ ও ‘হেলমেট বাহিনী’ আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করছে, এমন দাবি করেন তিনি।
জীবন বাঁচাতে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বিপরীতে নির্মাণাধীন একটি ভবনে আশ্রয় নেন জাকির। সেখান থেকে দক্ষিণ দিকে একটি গলিতে তিনি হাজী সেলিমের ছেলে সোলায়মান সেলিম, ইরফান সেলিম, মতিউর রহমান জামাল, হুমায়ুন কবির, নাসির আহমেদ, সজিব, এপাসি রাকিব, কমিশনার হাসিবুর রহমান মানিক, আনোয়ার হোসেন আনুসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও যুব মহিলা লীগের সদস্যদের দেখতে পান বলে জবানবন্দিতে বলেন।
তার দাবি, তারা তখনকার এমপি কামরুল ইসলামের ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’ হিসেবে কাজ করছিলেন এবং তাদের অনেকের হাতে অস্ত্র ছিল। তারা পুলিশের সঙ্গে থেকে গুলি করছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডের মসজিদের পেছনে সাততলা সরকারি কোয়ার্টারের সামনে নিজের ছোট ছেলে ইমতিয়াজ হোসেন ইফতি, তার বন্ধু খালেদ সাইফুল্লাহ ও মোহাম্মদ আশরাফুলসহ অনেকে আন্দোলনে ছিলেন বলে জানান জাকির। তার ভাষ্য, বিকাল ৫টার দিকে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও কামরুল ইসলামের ‘পেটুয়া বাহিনী’ সেখানে গুলি চালালে ইফতি, আশরাফুল, খালেদ সাইফুল্লাহসহ অনেকে গুরুতর আহত হন। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক খালেদ সাইফুল্লাহকে মৃত ঘোষণা করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। আশরাফুলের ডান চোখ গুলিতে অন্ধ এবং ডান হাত অচল হয়ে যায় বলেও দাবি করেন জাকির।
নামাজের সময় গুলি
বিকাল সাড়ে ৫টার পর আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডের মসজিদের পেছনে সাততলা সরকারি কোয়ার্টারের সামনে আন্দোলনে ছিলেন জাকির। এ সময় তার ডান চোখে টিয়ার শেল লাগলে চোখ বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন না বলে জানান।
তিনি মেয়র হানিফ জামে মসজিদে ঢুকে চোখে পানি দেন। পরে সেখানেই মাগরিবের নামাজে দাঁড়ান। তার জবানবন্দি অনুযায়ী, তখন পেছন থেকে যুবলীগ, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজন গুলি করতে থাকে। নামাজরত পেছনের দুই কাতারে থাকা অনেকের শরীরে গুলি লাগে বলে তিনি দাবি করেন।
নামাজ শেষে বাসায় ফেরেন জাকির। ছেলে ইফতিকে খুঁজতে সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাততলা সরকারি কোয়ার্টারের কলোনিতে যান। সেখানে ২৩ নম্বর ভবনের সামনে পুলিশ ও ‘হেলমেট বাহিনী’ দুলাল মোহাম্মদ নামে এক সরকারি কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যা করেছে বলে দেখতে পাওয়ার দাবি করেন তিনি।
১৯ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ
১৯ জুলাই সকালে বড় ছেলে রেজাকে খুঁজতে বের হন জাকির। ফোনে রেজা তাকে জানান, তিনি ঢাকা কলেজের আশপাশে আন্দোলনে আছেন। পরে ছেলে বাসায় ফিরে এসেছে জানতে পেরে তিনি আরেকটি কাজে বের হন।
বাড্ডা থেকে তার এক সাবেক সেনা সদস্য বন্ধু ফোন করে জানান, সেখানে অনেক ছাত্র আহত হয়েছেন এবং তাদের চিকিৎসার জন্য টাকা প্রয়োজন। বাসা থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা নিয়ে জাকির ফার্মগেটের বাইতুশ শরফ জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। এরপর জাহাঙ্গীর গেটে যান। সেখানে গিয়ে মহাখালী রেলগেটের দিক থেকে গুলি আসার কথা শুনতে পান বলে জানান তিনি। গুলির শব্দ কমে এলে মহাখালী রেলগেটের দিকে গিয়ে কয়েকজন আহত আন্দোলনকারীকে পড়ে থাকতে দেখেন। তাদের মধ্যে পরিচিত সায়েম খাঁনও ছিলেন। তার বুকে গুলি লেগেছিল বলে জাকির জানান। আন্দোলনকারীদের সহায়তায় তাকে রিকশায় তুলে হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা দেন তিনি।
এরপর বাড্ডার দিকে যাওয়ার পথে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের গুলিবর্ষণ দেখতে পান বলে জবানবন্দিতে বলেন জাকির। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার সামনে দিয়ে গুলশান পুলিশ প্লাজার সামনেও একই ধরনের গুলিবর্ষণ দেখতে পাওয়ার দাবি করেন তিনি।
পরে বাড্ডায় বন্ধুর কাছে পৌঁছান জাকির। সেখান থেকে রামপুরা ব্রিজের দিকে যাওয়ার সময় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজন গুলি করছিল বলে জানান তিনি। এ সময় পরিচিত ছোট ভাই আব্দুর রহমান ফোন করে জানান, তিনি ফরাজি হাসপাতাল-২-এর সামনে আন্দোলনে আছেন।
জাকির সেখানে গিয়ে আব্দুর রহমানকে ডান পায়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান এবং তাকে ফরাজি হাসপাতালে নিয়ে যান। রাত ১১টা পর্যন্ত সেখানে থাকার কথা জানান তিনি।
তার দাবি, ওই হাসপাতালে আরও অনেক গুলিবিদ্ধ আহত ব্যক্তিকে তিনি দেখেছেন, যাদের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা দিচ্ছিল না। ১৯ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাসায় ফিরে জাকির জানতে পারেন, ১৪ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে গণভবনে শেখ হাসিনার একটি গোপন বৈঠক হয়েছিল। সেখানে কারফিউ জারি ও সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে তিনি জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।
তার দাবি, ওই বৈঠকে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কামরুল এবং মেনন ছাত্রদের আন্দোলন বলপ্রয়োগে দমন করতে প্রয়োজনে গুলি করার পরামর্শ দেন। জাকিরের অভিযোগ, তাদের ওই পরামর্শ অনুযায়ী আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ আন্দোলনকারীদের গুলি করে হত্যা ও আহত করে।


