বাণিজ্যিক মোটরসাইকেল চালক ও জেলে মিরাজ শেখ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন—এমন অভিযোগ ঘিরে নানা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যদের দেওয়া পরস্পরবিরোধী তথ্য এবং মানবাধিকারকর্মীদের ভিত্তিহীন দাবির কারণে পুরো ঘটনাটিই এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন জয়মনিরগোল এলাকার থোডা গ্রাম থেকে নিখোঁজ হন মিরাজ শেখ।
পরিবারের সদস্য ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, সেদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে থোডা পয়েন্টের আল-আমিনের দোকান থেকে সাধারণ পোশাকে দুই কোস্টগার্ড সদস্য মিরাজকে তুলে নেন। পরে তাকে একটি মাছ ধরার নৌকায় করে শেলা নদীর ভেতরে থাকা স্থানীয়ভাবে পন্টুন নামে পরিচিত কোস্টগার্ডের ‘হারবাড়িয়া’ ভাসমান স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর রাত পৌনে ৮টার দিকে লাল-সাদা রঙের স্পিডবোটে করে এসে মিরাজকে সেখান থেকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান কোস্টগার্ড সদস্যরা।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পূর্ব ভাগকে জয়মনিরগোল থেকে পৃথক করেছে উপকূলীয় শেলা নদী। এই নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা থোডা প্রান্তিক জেলে, বনে সক্রিয় অপরাধী ও ডাকাতদের এলাকা হিসেবে পরিচিত। বনভিত্তিক অপরাধ দমন এবং বন ও স্থানীয়দের নিরাপত্তায় থোডা থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে ভাসমান এই স্টেশনটি পরিচালনা করে কোস্টগার্ড।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, ‘তখন থেকেই মিরাজের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এই গুমের জন্য কোস্টগার্ড দায়ী। পরিবারের সদস্য ও গ্রামবাসীদের সামনে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনার সবই জানে।’ তবে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের বক্তব্য ছাড়া অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন না করেই তিনি যোগ করেন, ‘কোস্টগার্ডকে অবশ্যই মিরাজকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।’
অন্যদিকে, পুলিশ এই নিখোঁজের বিষয়টিকে শুরু থেকেই রহস্যজনক বলে মনে করছে। মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, ঘটনার ১২ দিন পর ২৩ এপ্রিল মিরাজের স্ত্রী ও মা থানায় এসে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে অপহরণের সন্দেহের কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু তারা এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শীকেও হাজির করতে পারেননি যিনি মিরাজকে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন। গুমের স্বপক্ষে কোনো ছবি বা ভিডিও দেখাতে না পারায় আমরা জোরপূর্বক গুমের মামলার বদলে নিখোঁজের একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নথিভুক্ত করি।’
সম্প্রতি সরেজমিনে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘটনার সাথে যুক্ত মূল ব্যক্তিদের সাথে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। অনুসন্ধানে কথা হয় বনভিত্তিক ডাকাত দল ‘ছোট সুমন বাহিনী’র প্রধান ছোট সুমনের সাথে। কোস্টগার্ডের হাতে আটক হওয়ার কথিত সময়ের ২০ মিনিট পর মিরাজের সাথে তার মুঠোফোনে কথা হয়েছিল।
তিনি জানান, ডাকাতদের হাতে অপহৃত ছয় জেলের কাছ থেকে আদায় করা ছয় লাখ টাকা মিরাজের কাছে জমা ছিল। এতে ইঙ্গিত মেলে, সেই অর্থ হাতিয়ে নিতে মিরাজ নিজে আত্মগোপন করে থাকতে পারেন।
তাছাড়া, কোস্টগার্ডের কাছে দেওয়া মিরাজের মায়ের এক আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে জানা যায়, তার ছেলে ১০ বছর আগে জেল খেটেছিল। স্থানীয় ফারুক নামে এক গ্যাং লিডারের সাথেও তার অর্থ সংক্রান্ত ঝামেলা ছিল।
অভিযোগ ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য
নিখোঁজের প্রায় এক মাস পর, ৮ মে মোংলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন মিরাজের বোন লিজা ইসলাম। সেখানে তিনি দাবি করেন, ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টায় থোডার একটি দোকান থেকে কোস্টগার্ডের ‘বেশ কয়েকজন সদস্য’ মিরাজকে তুলে নেন। তখন মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন ও কয়েকজন গ্রামবাসী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
তবে মোংলা থানার ওসি জানান, মুক্তা খাতুন থানায় দেওয়া বক্তব্যে নিজে উপস্থিত থেকে সাধারণ পোশাকের দুজনকে মিরাজকে তুলে নিতে দেখার কথা বলেননি।
সংবাদ সম্মেলনে লিজা আরও দাবি করেন, পরদিন ১১ এপ্রিল পরিবারের সদস্যরা মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ড ঘাঁটিতে গেলে বিকাল ৪টায় মিরাজকে হাজির করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যা পরে অস্বীকার করে কোস্টগার্ড। এমনকি হারবাড়িয়া স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিরাজকে আটকের কথা স্বীকার করে দুই-তিন দিনের মধ্যে ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলেও লিজা দাবি করেন।
পরবর্তীতে ২৬ মে বাগেরহাট প্রেস ক্লাবে দ্বিতীয় সংবাদ সম্মেলনে লিজা তার বক্তব্যে পরিবর্তন আনেন। এবার তিনি বলেন, ‘সাধারণ পোশাকে দুজন কোস্টগার্ড সদস্য’ মান্নান নামের এক ব্যক্তির নৌকায় করে মিরাজকে পন্টুনে নিয়ে যান এবং সেখানে গ্রামবাসীদের সামনে তাকে মারধর করেন। এর ৩০-৪০ মিনিট পর ইউনিফর্ম পরা সাত-আটজন সদস্যসহ কোস্টগার্ডের একটি স্পিডবোট এসে ছবি ও ভিডিও তুলে মিরাজকে নিয়ে যায়।
লিজা আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার ৮-১০ দিন পর পন্টুন থেকে রাত গভীরে এসে রবিন নামের এক কোস্টগার্ড সদস্য ও মুখ ঢাকা অন্য একজন মিরাজের মোটরসাইকেল নিয়ে যান। কিন্তু বিদ্যুৎহীন প্রত্যন্ত গ্রামের অন্ধকারের মধ্যে কে মুখ ঢাকা লোকটিকে দেখল বা রবিনের পরিচয় কীভাবে জানা গেল, তার স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। কোস্টগার্ড জানিয়েছে, রবিন নামে তাদের কোনো সদস্য নেই।
পরবর্তীতে যোগাযোগের পর লিজা দাবি করেন, ১০ এপ্রিল মাগরিবের আজানের পরপরই সন্ধ্যা ৭টার দিকে মিরাজকে তুলে নেওয়া হয়। অথচ অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই দিন মাগরিবের আজান হয়েছিল সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটের আগেই।
লিজা আরও জানান, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা মোশা খান প্রথমে মিরাজের স্ত্রী মুক্তাকে ফোন করে মিরাজকে তুলে নেওয়ার খবর জানান। কিন্তু মোশাও নিজে তা দেখেননি, তিনি অন্য একজনের কাছ থেকে সেকথা শুনেছিলেন।
সেলিনার কাছ থেকে শুনেছিলেন মোশা
২৮ আগস্ট সন্ধ্যায় জয়মনিরগোল বাজারে মোশা খানের সাথে কথা হলে তিনি জানান, ঘটনার দিন তিনি খুলনায় ছিলেন। মাগরিবের পর সেলিনা নামের স্থানীয় এক নারী তাকে ফোন করে জানান, কোস্টগার্ড মিরাজকে তুলে নিয়ে গেছে। সেলিনা নিজে এই ঘটনা দেখেছেন বলে মোশাকে নিশ্চিত করেছিলেন।
মোশা বলেন, ‘এরপর আমি আমার ছোট ভাই দুলালকে জানাই। মিরাজের মা থোডায় ছুটে গিয়ে পন্টুনে মিরাজকে দেখতে পান। পরে তারা ইউপি সদস্য নাজমুলের কাছে গেলে নাজমুল কোস্টগার্ডের কন্টিনজেন্ট কমান্ডারকে (সিসি) ফোন করেন। সিসি জানান, জিজ্ঞাসাবাদের পর মিরাজকে আদালতে দেওয়া হবে বা পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হবে।’
মোশার বক্তব্যের বিপরীত কথা সেলিনার
২৯ আগস্ট মংলায় সেলিনার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোশার দাবি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। সেলিনা বলেন, ‘আমি বাড়িতে ছিলাম। মিরাজকে নিয়ে যেতে আমি দেখিনি।’
তিনি জানান, মাগরিবের পর কয়েকটি শিশু এসে তার কাছে মিরাজকে তুলে নেওয়ার খবর দিলে তিনি মোশাকে ফোন করেন। কারণ মোশার কাছে মিরাজের পরিবারের নম্বর ছিল। মিরাজকে নিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ভিড় জমে যাওয়ার পরিবারের দাবিও নাকচ করেন তিনি।
সেলিনা জানান, রাত ৮টার দিকে মিরাজের স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়ি তার বাড়িতে এলে তিনি তাদের নিয়ে থোডায় যান, কিন্তু সেখানে কাউকে পাননি। সেলিনা আরও জানান, তার নিজের স্বামীর সঙ্গে যৌথভাবে মাছ ধরার লভ্যাংশের তিন হাজার টাকা মিরাজের কাছে থাকায় তিনি ১০ এপ্রিল তাকে তিনবার ফোন করেছিলেন।
পরবর্তী ঘটনা বর্ণনা করে সেলিনা বলেন, ‘কয়েকদিন পর লিজা এসে জানায় তারা মিরাজের একটি নতুন সিম (০১৯৬৩৯৯৪৭৭২) তুলে কল লিস্টে আমার ফোন করার প্রমাণ পেয়েছে। এখন তারা আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে এবং কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দিতে হুমকি দিচ্ছে।’
সাইবার নিরাপত্তা ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বিষয়টির অসঙ্গতি তুলে ধরে বলেন, ‘নতুন সিম কার্ড দিয়ে পুরনো কল রেকর্ড পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাছাড়া আসল মালিক ছাড়া অন্য কেউ নতুন সিম তুলল কীভাবে? তদন্তকারীদের এ বিষয়ে গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান করা দরকার।’
অন্যদিকে, মিরাজের শ্বশুর জামাল দাবি করেন, তিনি রাত ৯টা থেকে ৯টা ৩০ মিনিটের মধ্যে পন্টুনে মিরাজকে দেখেছেন এবং লাল-কালো স্ট্রাইপযুক্ত একটি বোটে তাকে নিয়ে যেতে দেখেছেন। তার এই বক্তব্য রাত সাড়ে ৭টায় মিরাজকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তার মেয়ে ও বেয়ানের দেওয়া বক্তব্যের সাথে মেলে না। আবার, ঘটনার রাতে ইউপি সদস্যের কাছে যাওয়ার বিষয়ে জামালের বক্তব্য ইউপি সদস্য নিজে অস্বীকার করেছেন। পন্টুনে দেখার পর কোনো ছবি বা ভিডিও রাখা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে জামাল ‘না’ সূচক উত্তর দেন।
কোস্টগার্ডকে ফোন করার কথা অস্বীকার নাজমুলের
জয়মনিরগোল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নাজমুল হাওলাদার (নাজমুল মেম্বার) স্পষ্ট জানান, তিনি মিরাজের গুম হওয়া দেখেননি। কোস্টগার্ড সদস্যরা মিরাজকে তুলে নিতে দেখেছেন এমন কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর কথাও শোনেননি।
তিনি জানান, ১১ এপ্রিল রাত ৯টায় পরিবারের সদস্যরা এসে অপহরণের কথা বললেও তারা নিজেরা দেখেননি বলে জানান। তবে ১০ দিন পর এসে মিরাজের মা দাবি করেন, তিনি কোস্টগার্ডকে তুলে নিতে দেখেছেন। তখন নাজমুল মেম্বার তাদের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন।
তবে টাইমসের সংগৃহীত ও যাচাইকৃত কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বলছে, কথিত গুমের সময়ে (সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টা) মিরাজের মা মোংলায় ছিলেন, যা ঘটনাস্থল থেকে অন্তত এক ঘণ্টার পথ। তিনি রাত ১০টা ১৫ মিনিটে জয়মনিরগোলে পৌঁছান।
নাজমুল মেম্বার আরও বলেন, ‘মিরাজের মা দিগরাজে কোস্টগার্ড ঘাঁটির সামনে মানববন্ধনের প্রস্তাব দিলে আমি তা প্রত্যাখ্যান করি। পরবর্তীতে তাদের নেতৃত্বে একদল লোক কোস্টগার্ড পন্টুনে হামলা চালায়, যাতে বেশ কয়েকজন কোস্টগার্ড সদস্য আহত হন।’
দোকানদারের অস্বীকৃতি
এক ভিডিও বার্তায় দোকানদার আল-আমিন তার দোকানের সামনে থেকে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে মিরাজকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করলেও পরবর্তীতে ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলেন।
আল-আমিন বলেন, ‘মিরাজ আর আমি একসাথে বড় হয়েছি। আমার দোকান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়নি। আমি কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে মিথ্যা বক্তব্য দিয়েছিলাম।’
তিনি স্বীকার করেন, যশোরে থাকা মিরাজের বোন লিজা এসে তাকে বুঝিয়েছিলেন যে কোস্টগার্ডকে দোষ দিলে মিরাজকে দ্রুত ফেরত পাওয়া যাবে। সে অনুযায়ীই তিনি ভিডিওতে কথা বলেন। পরবর্তীতে একজন মানবাধিকারকর্মী কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে কথা না বললে মামলা দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন বলেও আল-আমিন অভিযোগ করেন।
মিরাজের কাছে মুক্তিপণের টাকা ছিল
পুলিশি নথি অনুযায়ী, মিরাজ শেখের অতীত রেকর্ড অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ভরা। সুন্দরবনের অপরাধী ও ডাকাত দলের সাথে তার সম্পর্ক ছিল। তার বাবাও একসময় বনভিত্তিক ডাকাত ছিলেন, যিনি পরে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরেন।
মিরাজ অন্তত সাতটি সিম কার্ড ব্যবহার করতেন। এর মধ্যে একটি সিম ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে—অর্থাৎ তার কথিত গুমের ২০ মিনিট পর পর্যন্ত সক্রিয় ছিল।
সিডিআর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৭টা ২১ মিনিটে জয়মনিরগোল থেকে সুন্দরবনের অপরাধী চক্র ‘ছোট সুমন বাহিনী’র প্রধানের সাথে কথা বলেন মিরাজ। কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণকারী ছোট সুমন এই প্রতিবেদককে জানান, ‘মিরাজ আমাদের সমবয়সী। আমরা বনে থাকলে সে ডাঙা থেকে আমাদের রসদ এনে দিত, যার বিনিময়ে তাকে টাকা দিতাম।’
সুমন বলেন, ‘সুন্দরবনে জিম্মি করা ছয় জেলের মুক্তির বিনিময়ে সংগৃহীত ৬ লাখ টাকা মিরাজের কাছে ছিল। টাকাটা আমাকে দেওয়ার কথা থাকলেও সে কয়েকদিন ধরে ঘোরাচ্ছিল। ১০ এপ্রিল মাগরিবের পর সে ফোন করে জানায়, বনের পাশ ফেরত দিয়ে সাইলো গেটের কাছ থেকে ফরেস্ট অফিসে যাচ্ছে। হঠাৎ কল কেটে যায় এবং এরপর থেকে তার ফোন বন্ধ।’
তিনি আরও বলেন, ‘টেলিভিশনে আমি ৬ লাখ টাকার কথা প্রকাশের পর মিরাজের মা এসে অভিযোগ করেন। আমি বলি, মিরাজ ফিরে এলে বক্তব্য ফিরিয়ে নেব। তখন তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের ভবিষ্যৎ আছে, আমি কীভাবে বলব?’
ছোট সুমনের আশঙ্কা, এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিতে মিরাজ নিজে আত্মগোপন করেছেন অথবা অন্য কেউ তাকে সরিয়ে দিয়েছে।
ফারুকের সাথে মিরাজের ঝামেলা
গত ১১ আগস্ট পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে কোস্টগার্ডের কাছে দেওয়া এক লিখিত জবানবন্দিতে মিরাজের মা তাসলিমা বেগম স্বীকার করেন, ঘটনার সময় তিনি মোংলায় ছিলেন এবং রাত ৮টায় থোডায় যান। ১০ বছর আগে মিরাজ জেল খেটেছিল এবং বছর দুয়েক আগে স্থানীয় ফারুক নামের এক ব্যক্তির সাথে তার আর্থিক লেনদেন নিয়ে মারাত্মক বিরোধ ছিল।
কোস্টগার্ডের বক্তব্য
সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এক লিখিত বক্তব্যে জানান, ‘মিরাজ শেখের কথিত জোরপূর্বক গুমের সাথে কোস্টগার্ড কোনোভাবেই জড়িত নয়। আমাদের ৩১ বছরের ইতিহাসে আমরা কখনো জোরপূর্বক গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়াইনি। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়াই আমাদের কাজ, এমনকি আমাদের কোনো নিজস্ব হাজতখানাও নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরিবারের সদস্যরা পুলিশ বা কোস্টগার্ডের কাছে দেওয়া লিখিত জবানবন্দিতে কোথাও কোস্টগার্ডকে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন বলে উল্লেখ করেননি। মিডিয়া এবং সংবাদ সম্মেলনে তাদের দেওয়া বক্তব্য সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী ও ভিত্তিহীন। তাছাড়া বিদ্যুৎহীন দুর্গম এলাকায় রাত ৮টায় বোটের লাল-নীল রঙ চেনা বা কোনো ছবি-ভিডিও না থাকা অবাস্তব।’
সাব্বির আলম আরও বলেন, ‘আমাদের পন্টুনটি থোডায় স্থানান্তরিত হওয়ায় সুন্দরবনে জেলেদের অপহরণ ও বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অপরাধী চক্রগুলোর কোটি কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা বন্ধ হয়ে পড়েছে। কোস্টগার্ডের উচ্চ মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং স্টেশনটি সেখান থেকে সরিয়ে দিতেই এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারের উচিত ছিল কোনো পক্ষকে না জড়িয়ে নিখোঁজ স্বজনকে খোঁজার দাবি জানানো।’
‘ভুক্তভোগীদের ঢালাওভাবে দোষ দেওয়া উচিত নয়’
পুরো বিষয়টি নিয়ে সাবেক মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট বাহিনী তাকে তুলে নিয়ে গেছে—এমন পূর্বধারণা নিয়ে এগোলে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয়। সব দিক খোলা রেখে তদন্তকারীদের এগোতে হবে।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক কমোডর (অব.) মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘সুন্দরবনে কোস্টগার্ডের অভিযানের কারণে অপরাধী নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা থেকে অসন্তোষ থাকা স্বাভাবিক। তবে মিরাজের অপরাধমূলক অতীত থাকলেও তাকে গুম করা সমর্থন করা যায় না। শুধু পরিবার বা স্থানীয়দের অভিযোগের ওপর নির্ভর না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত নিজস্ব তদন্তের মাধ্যমে মূল সত্য উদঘাটন করা।’
(কামরান রেজা চৌধুরী একজন ফ্রিল্যান্স অনুসন্ধানী সাংবাদিক)


