‘একজনের শরীরে সাত শতাধিক গুলির চিহ্ন দেখেছি’

‘একজনের শরীরে সাত শতাধিক গুলির চিহ্ন দেখেছি’
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অবশিষ্ট জবানবন্দি দিয়েছেন সাক্ষী মো. জাকির হোসেন।

এ জবানবন্দিতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ, বাসায় বাসায় তল্লাশি এবং হামলার বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা উঠে আসে।

তিনি বলেন, বাড্ডায় বন্ধু খলিলুর রহমানের শরীরে সাত শতাধিক গুলির চিহ্ন দেখেছি। তার ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকালে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বিপরীতের একটি গলিতে খলিলকে আহত অবস্থায় খুঁজে পান তিনি। পরে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। খলিলুর রহমান বর্তমানে পঙ্গু হয়ে আছেন বলেও জবানবন্দিতে জানান জাকির।

বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন জাকির হোসেন। জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করা হয়। এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর তিনি আংশিক জবানবন্দি দিয়েছিলেন।

জবানবন্দিতে জাকির হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাসা থেকে ফোন করে আমাকে জানানো হয়, বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজা নীলক্ষেত এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। একই সময়ে জানতে পারি, নিউমার্কেটের ২ নম্বর গেটে ব্যবসায়ী আব্দুল ওয়াদুদ এবং আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টারের গেটে একজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন।

তিনি বলেন, বন্ধু খলিলুর রহমানের সঙ্গে থাকার সময় জানতে পারি, ওই দিন জুমার নামাজের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড্ডা ও রামপুরা এলাকায় ছয়-সাতজন নিহত হয়েছেন।

তাদের মধ্যে ১১ বছরের শিশু তামিম শিকদারও ছিল। জাকিরের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিজেও ওই এলাকায় কয়েকজন আন্দোলনকারীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।

কারফিউ ও গুলির সিদ্ধান্তের দাবি

জাকির হোসেন বলেন, ১৪ দলের বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রেস ব্রিফিং করে কারফিউ জারি ও গুলি করার সিদ্ধান্তের কথা জানান।

তার দাবি, ওই সময় ওবায়দুল কাদেরের পাশে ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা রাশেদ খান মেনন উপস্থিত ছিলেন এবং কামরুল ইসলামও ওই বৈঠকে ছিলেন।

আরও পড়ুন

২০ জুলাই সকাল থেকে র‍্যাব, পুলিশ, বিজিবি, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় বাসায় বাসায় তল্লাশি শুরু করে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। তার অভিযোগ, আন্দোলনকারী ছাত্রদের মারধর করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের লোকজন আন্দোলনকারীদের বই-পুস্তক পুড়িয়ে এবং টাকা-পয়সা নিয়ে নেয় বলেও তিনি দাবি করেন। তার বাসাতেও তল্লাশি চালানো হয়েছিল বলে জানান তিনি।

জাকির বলেন, একপর্যায়ে আমাকেও খোঁজা শুরু হলে ২৪ জুলাই তিনি চট্টগ্রামে চলে যাই। গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়াতেও পুলিশ ও আওয়ামী লীগের লোকজন হামলা করলে ২৬ জুলাই ঢাকায় ফিরে আসি। ২ আগস্ট রাতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজন আমার আজিমপুরের বাড়ি ঘেরাও করলে ছাদ থেকে অন্য ছাদে লাফিয়ে পালিয়ে যাই। পরদিন ভোরে আবার চট্টগ্রামে চলে যাই। ওই দিন রাতে সাতকানিয়ার বাড়িতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের লোকজন আমার ওপর হামলা চালায়।

চট্টগ্রামে গুলিবিদ্ধ নূরুল্লাহ

৪ আগস্ট চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়ে জাকির হোসেন বলেন, সেখানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনজীবীরাও ছিলেন। সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে আমার পাশে থাকা চট্টগ্রাম ইসলামিক ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ছাত্র এ কে এম নূরুল্লাহ পুলিশ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের গুলিতে আহত হন।

জাকিরের ভাষ্য, নূরুল্লাহর কোমর থেকে পা পর্যন্ত অসংখ্য গুলি লাগে। তার রানে একটি গুলি লেগে মাংস ছিঁড়ে যায়। হতদরিদ্র ওই শিক্ষার্থীর চিকিৎসায় তিনি সহায়তা করেন। তার দাবি, নূরুল্লাহ বর্তমানে পঙ্গু হয়ে গেছেন।

ওই সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সদস্যদের হাতে অস্ত্র দেখেছেন বলেও জবানবন্দিতে জানান জাকির। তার দাবি, তাদের অনেককেই তিনি চিনতে পেরেছিলেন।

চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা, বকশিরহাট, চট্টগ্রাম কোর্ট এলাকা, নিউমার্কেট, ষোলশহর ও ওয়াসা মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও পুলিশের গুলিতে ‘হাজার হাজার’ আন্দোলনকারী ও সাধারণ ব্যবসায়ী আহত ও নিহত হন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। তার তিন কর্মচারীও ছররা গুলিতে আহত হন বলে জানান। ৪ আগস্ট রাতে আট-নয়বার গাড়ি পরিবর্তন করে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন।

৫ আগস্টের বর্ণনা

জাকির হোসেন বলেন, ৫ আগস্ট গণভবন ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নিতে তিনি আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের সঙ্গে নিয়ে আজিমপুর-নিউমার্কেট এলাকা থেকে সকাল ১১টার পর গণভবনের উদ্দেশে রওনা হন। তার দাবি, ওই দিন সকালে চানখারপুল, শহীদ মিনার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন ও গুলিবর্ষণ করা হয় এবং অনেকে হতাহত হন।

তার ভাষ্য, পথে বিভিন্ন জায়গায় বাধার মুখে পড়ার একপর্যায়ে দুপুর ১টার দিকে তারা শুনতে পান শেখ হাসিনা পালিয়ে যাচ্ছেন। পরে তারা গণভবনে আনন্দ মিছিলে যোগ দেন।

ওই দিনের বিকালের ঘটনার বর্ণনায় জাকির বলেন, দুপুর আনুমানিক ৩টার দিকে বন্ধু খলিলুর রহমান আমাকে ফোন করে জানান, তারা রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় রয়েছেন এবং পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের লোকজন তাদের ঘেরাও করে রেখেছে। যেকোনো সময় তাদের হত্যা করা হতে পারে জানিয়ে খলিলুর রহমান তাকে উদ্ধারের জন্য সহায়তা চান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।

জাকিরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকাল ৫টার দিকে তিনি বাড্ডায় পৌঁছে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বিপরীতের একটি গলিতে খলিলুর রহমানকে খুঁজে পান। সেখানে তার শরীরে সাত শতাধিক গুলির চিহ্ন দেখতে পান বলে জানান জাকির। পরে তাকে পাশের একটি বাড়িতে নিয়ে রাখা হয় এবং হাসপাতালে পাঠানো হয়। খলিলুর রহমান সরকারের সহায়তায় পাঁচ মাস ধরে থাইল্যান্ডে চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে দেশে আছেন এবং তিনি পঙ্গু হয়ে গেছেন বলেও জবানবন্দিতে জানান জাকির।

জবানবন্দির শেষ দিকে জাকির হোসেন বলেন, গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানতে পারি, শেখ হাসিনার নির্দেশে ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের কু-পরামর্শে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা ও আহত করা হয়েছিল।

তার জবানবন্দি অনুযায়ী, ওবায়দুল কাদের, রাশেদ খান মেনন ও অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম শেখ হাসিনার অন্যতম পরামর্শদাতা এবং হত্যার নির্দেশদাতা ছিলেন। রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন সাক্ষী জাকির হোসেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর