জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল ও লেখক মুহাম্মদ জাফর ইকবালসহ আটজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ছাড়াও মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আ ক ম জামাল উদ্দিন এবং ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকেও আসামি করা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিষয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা মাকসুদ কামালসহ আটজনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেয়।
প্রসিকিউশন জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা শেষে সেটিকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রেক্ষাপট, বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা দীর্ঘ তদন্তের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রসিকিউশন সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে অভিহিত করেন। প্রসিকিউশনের ভাষ্য, ওই বক্তব্য আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও সহিংসতার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখে এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগের হামলার পটভূমি তৈরি করে।
ওই দিন রাতে শেখ হাসিনা ও তৎকালীন উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামালের মধ্যে হওয়া একটি ফোনালাপেও আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশনার তথ্য পাওয়া গেছে বলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের দাবি, ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন শতাধিক নিরস্ত্র আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর ওপর ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা হামলা চালায়। হামলায় শিক্ষার্থীদের মারধর, কুপিয়ে ও গুলি করে আহত করা হয়। পরে আহতদের একটি অংশ চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে সেখানেও তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক জাফর ইকবালের একটি লেখাকেও তদন্তে অভিযোগের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুই পৃষ্ঠার একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার বিশ্ববিদ্যালয়, আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু আমার মনে হয়, আমি আর কখনো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইব না। শিক্ষার্থীদের দেখলে আমার মনে হবে, তারা হয়ত রাজাকার।’
প্রসিকিউশন সূত্রের মতে, আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ হিসেবে চিহ্নিত করে শেখ হাসিনার বক্তব্য যেমন ঘৃণা ও সহিংসতা উসকে দেয়, তেমনি জাফর ইকবালের ওই মন্তব্যও একই ধরনের ঘৃণা উৎপাদন, উসকানি এবং পরবর্তী হামলাকে বৈধতা দেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সেই কারণেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় তার ভূমিকা আনুষ্ঠানিক অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাফর ইকবালের ওই লেখাটি ১৬ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন ১৭ জুলাই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাকে আজীবনের জন্য ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।


