বিদেশে পাচার করা সম্পদ উদ্ধারে বিশেষায়িত সংস্থা গঠন, কর ব্যবস্থা সহজ ও স্বচ্ছ করা, দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা এবং জাকাত ও কৃষি খাতকে আরও কার্যকর করার কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
রোববার জাতীয় সংসদে পৃথক প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান তিনি।
পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে বিশেষায়িত সংস্থা
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদেশে পাচার করা সম্পদ দক্ষ ও কার্যকরভাবে উদ্ধারের লক্ষ্যে অন্যান্য দেশের আদলে বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত সংস্থা গঠনের বিষয়টি সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
তিনি জানান, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা ও ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্সের সুপারিশে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় ১১টি অগ্রাধিকার মামলা চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব মামলায় দুদকের নেতৃত্বে ১১টি জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে। জেআইটিতে পুলিশ, এনবিআর ও কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এসব মামলায় দেশে ও বিদেশে আদালতের মাধ্যমে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ ও ফ্রিজ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে।
এখন পর্যন্ত পাচার করা অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে ১৪২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং ছয়টি মামলার রায় হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সহজ ও স্বচ্ছ হচ্ছে কর ব্যবস্থা
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু বলেন, করদাতাদের মধ্যে কর নির্ধারণ ও নিরীক্ষা নিয়ে যে ভয় রয়েছে, তা দূর করতে কর ব্যবস্থা সহজ ও অধিকতর স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এনবিআরের মধ্যে করনীতি প্রণয়ন এবং কর প্রশাসন ও বাস্তবায়নকে পৃথক করার দিকে সরকার এগোচ্ছে। এর ফলে দুর্নীতি ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমবে।
কর ব্যবস্থাকে সহজ করা হলে আরও বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় করের আওতায় আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চলবে
দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে এবং কাউকে দায়মুক্তি দেওয়া হবে না বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
তবে কোনো কোম্পানির মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেই কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়া হবে না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। তার মতে, কোম্পানির আইনগত সত্তা এবং ব্যক্তির ব্যক্তিগত দায় আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির অভিযোগে ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার চলবে। তবে কর্মসংস্থান, ঋণ পরিশোধ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বার্থে আইনসম্মত হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কার্যক্রম চালু রাখার সুযোগ থাকতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আইন লঙ্ঘন করে খেলাপি কোম্পানিকে ঋণ সুবিধা দিচ্ছে—এমন অভিযোগও নাকচ করেন তিনি। প্রচলিত আইনে সুযোগ থাকলে যোগ্য কোম্পানিগুলো ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের সুবিধা পেতে পারে বলে জানান তিনি।
জাকাত ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ
দেশের জাকাত ব্যবস্থাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান আমির খসরু।
তিনি বলেন, ২০২৩ সালে জাকাত আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সরকারি জাকাত ফান্ডের পাশাপাশি মাদ্রাসা, মক্তব, এতিমখানা ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ করছে।
জাকাত ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে একটি জাকাত বোর্ড গঠনের কাজ চলছে। একই সঙ্গে সারাদেশে জাকাত বিভাগের কার্যক্রম সংস্কার, আধুনিকায়ন ও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি জাকাত ফান্ডে দেওয়া জাকাতের রসিদ আয়কর রিটার্নের সঙ্গে সংযুক্ত করে কর রেয়াত পাওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কৃষকদের সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস
কৃষকদের ঋণসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দিয়ে কৃষিকাজ অব্যাহত রাখার সুযোগ তৈরি করতে সরকার কাজ করছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কৃষিনীতি প্রণয়নে কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ গ্রহণকারী ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
তবে কৃষকদের সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা বর্তমানে সরকারের নেই বলে জানান তিনি। কৃষি ও পল্লী ঋণ সহজ শর্তে এবং কম সুদে বিতরণ করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।


