প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বৈষম্য দূর করে সমঅধিকার নিশ্চিতের দাবি

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বৈষম্য দূর করে সমঅধিকার নিশ্চিতের দাবি
এসডিজি সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠান। ছবি: ভিডিও থেকে
Advertisement
Advertisement

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে থাকা, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) না থাকা, কর্মসংস্থান ও মৌলিক সেবায় বৈষম্যের কারণে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো উন্নয়নের মূলধারার বাইরে রয়েছে। প্রতিবন্ধী, হিজড়া ও তৃতীয় লিঙ্গ, অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক, পার্বত্য এলাকার বাসিন্দা এবং ভাসমান জনগোষ্ঠীসহ পিছিয়ে পড়া মানুষের বৈষম্য দূর করে সমঅধিকার নিশ্চিতের দাবি উঠেছে এসডিজি-বিষয়ক সম্মেলনে।

বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সংস্কার ও উন্নয়নে পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামো ও এসডিজি’ শীর্ষক অধিবেশনে বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তাদের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার কথা তুলে ধরে এসব দাবি জানান।

বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের (জিআইইউ) যৌথ উদ্যোগে তিন দিনের এসডিজি-বিষয়ক এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। সভাপতিত্ব করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

আলোচনায় তরুণ সমাজের প্রতিনিধি সোহানুর রহমান বলেন, কুড়িগ্রামে দারিদ্র্য কিছুটা কমলেও বরিশালে তা বেড়েছে। মানতা সম্প্রদায়ের মানুষের জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যু-সবই নৌকায় হলেও তাদের অনেকের এনআইডি, টয়লেটসহ মৌলিক সেবা নেই। ফলে সরকারি সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। শুধু আশ্বাস না দিয়ে জলবায়ু তহবিল থেকে যুবকদের সবুজ উদ্যোগে সরাসরি অর্থায়নের দাবিও জানান তিনি।

অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের সুরক্ষার বিষয়টি তুলে ধরে গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের প্রতিনিধিরা বলেন, দেশের ৮৫ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রম আইন ২০২৬ বাস্তবায়ন, জাতীয় সর্বনিম্ন মজুরি এবং এসডিজি-৮ অনুযায়ী শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি নারী শ্রমিকদের সুস্থ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়।

প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা প্রকৃত প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষের কাছে সামাজিক সুরক্ষার সম্পদ পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানান। শৈশব থেকেই কেয়ারগিভার সেবা ও সহায়ক যন্ত্র সহজলভ্য করা, ট্রেন স্টেশনসহ দেশের সব ধরনের গণপরিবহন প্রতিবন্ধীবান্ধব করা এবং প্রতিবন্ধী মানুষের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে সরকারি পরিসংখ্যানের অসঙ্গতি দূর করার দাবি জানান তারা।

আরও পড়ুন

বন্ধু ওয়েলফেয়ার সোসাইটির প্যারালিগ্যাল প্রতিনিধি রামিছা চৌধুরী বলেন, ২০১৩ সালে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি মিললেও এখনো এ জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি সুরক্ষা তৈরি হয়নি। এনআইডি না থাকায় তাদের অনেকে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি বাসাবাড়ি ভাড়ায় বৈষম্য দূর করা, সুনির্দিষ্ট কর্মসংস্থান ও বিশেষ ফ্যামিলি কার্ড চালু এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণ শেষে কাজ শুরুর জন্য পর্যাপ্ত ঋণ ও আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।

পার্বত্য এলাকার প্রতিনিধিরা দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষক ও চিকিৎসকের সংকট, পানি সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে দ্রুত এসব নাগরিক সেবার আওতায় আনার দাবি জানান তারা।

আলোচনায় সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, মূলত জন্মনিবন্ধন না থাকার কারণেই অনেকের এনআইডি পেতে জটিলতা হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

এসডিজি বাস্তবায়নে হাতে সময় কম উল্লেখ করে সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১১০তম। হাতে সময় আছে পাঁচ বছরের কম। ফলে এখন দ্রুতগতিতে এগোতে হবে।

দেশের উন্নয়নে সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, পিছিয়ে পড়া ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনতে সরকার বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, পাহাড়ে বা সমতলে বসবাসকারী কিংবা সক্ষম বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন-সবাই বাংলাদেশের অংশ। প্রত্যেকের সমান অধিকার, স্বাধীনতা এবং উন্নয়নের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

অনুষ্ঠানে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রবৃদ্ধির হার কত হচ্ছে, শুধু তা দেখলে হবে না, কাঠামো ও গুণগত মান দেখতে হবে। সম্প্রতি দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমে গেছে, বেড়েছে বৈষম্য। বাস্তবতা হলো, প্রতি তিনজন শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে একজন বেকার।

এই পরিপ্রেক্ষিতে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের পরামর্শ, সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে নীতি প্রণয়ন করতে হবে।

সমাপনি অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ মুহাম্মদ আব্দুর রহিম সাকী বলেন, এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের সামনে ৪২১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ। এসডিজি বাস্তবায়ন শুধু আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণ কিংবা প্রতিবেদন তৈরির বিষয় নয়। মানুষের জীবনে সত্যিকারের উন্নতি ঘটানোই সরকারের মূল লক্ষ্য।

জোনায়েদ সাকী বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনার দুয়ারে পৌঁছেছে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার কৌশলপত্র তৈরি করছে। এই কৌশলপত্রে জনগণের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এসডিজি কোনো দাতব্য কর্মসূচি নয়। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা এবং নাগরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করা। মানুষকে শুধু ভাতা বা নগদ সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করা সম্ভব নয়। যার যেখানে সম্ভাবনা রয়েছে, সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad