এবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খ্যাতনামা সম্প্রচারমাধ্যমটির অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘প্যানোরোমায়’ তার একটি ভাষণ সম্পাদনা করে ‘পক্ষপাতমূলক’ এবং ‘ভুলভাবে উপস্থাপন’ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ট্রাম্প।
বার্তা সংস্থা এপি’র খবরে বলা হয়, ট্রাম্পের আইনজীবী আলেহান্দ্রো ব্রিটোর পাঠানো এক চিঠিতে বিবিসিকে ‘মিথ্যা, মানহানিকর, অপমানজনক ও উসকানিমূলক বক্তব্য’ প্রত্যাহার, প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং ট্রাম্পকে নিয়ে মানহানিকর বার্তা প্রচারে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যথায় বিবিসির বিরুদ্ধে এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ মামলা করা হবে বলে হুমকি দেন তিনি।
এমন আইনি চিঠি পাওয়ার পর এক বিবৃতিতে বিবিসি জানিয়েছে, তারা চিঠিটি গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করবে এবং ‘সময়মতো সরাসরি জবাব দেবে’।
এদিকে ট্রাম্পের অভিযোগ আমলে নিয়ে এরইমধ্যে পদত্যাগ করেছেন বিবিসির মহাপরিচালক টিম ডেভি এবং বার্তা বিভাগের প্রধান ডেবোরা টারনেস। রোববার সংবাদমাধ্যমটির ওই শীর্ষ দুই কর্মকর্তা ‘ভুল তথ্য’ সম্প্রচারের বিতর্কের জেরে পদ ছেড়ে দেওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
সোমবার বিবিসির চেয়ারম্যান সামির শাহ এই ভুলকে ‘সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভুল’ উল্লেখ করে ক্ষমা চেয়েছেন। শাহ বলেন, ‘ভাষণটি যেভাবে সম্পাদনা করা হয়েছিল, তাতে এটিই প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে- ট্রাম্প সরাসরি সহিংসতার আহ্বান জানিয়েছেন। ওই ভাষণে উত্তেজনা সৃষ্টির মতো বক্তব্য থাকলেও সরাসরি সহিংসতা ছড়ানোর নির্দেশ দেওয়ার মতো কিছু ছিল না।’
একইসঙ্গে বিবিসি কোনো পক্ষপাতিত্ব করে না দাবি করে তিনি ডেভি ও টারনেসের পক্ষ নিয়ে বলেন, ‘আমাদের সাংবাদিকরা কঠোর পরিশ্রম করেন এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে সদা সচেষ্ট থাকেন। আমি তাদের এই সাংবাদিকতার পাশে আছি। আমাদের প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাত নেই। ভুল হয়, কিন্তু কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাত নেই।’

ট্রাম্পকে নিয়ে নির্মিত ‘ট্রাম্প: দ্বিতীয় সুযোগ?’ নামের একঘণ্টার ওই প্রামাণ্যচিত্রটি বিবিসির ‘প্যানোরোমা’ সিরিজের অংশ। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কয়েক দিন আগে ওই ভিডিওটি প্রচার করা হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্পের ৫৫ মিনিটের ভাষণ থেকে কাটছাঁট করে ভিন্নভাবে তুলে ধরার অভিযোগ ওঠে বিবিসির বিরুদ্ধে।
সম্পাদিত ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রাম্প ওয়াশিংটনে ক্যাপিটল হিল ভবনে হামলা চালাতে তার সমর্থক ও অনুসারীদের উস্কানি দেন। তবে বিবিসির সম্পাদকীয় নীতিমালা বিষয়ক কমিটির ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্যাডভাইজার বা নিরপেক্ষ উপদেষ্টা মাইকেল প্রেসকটের ফাঁস করা তথ্যে বলা হয়, মূলত ট্রাম্পের ওই ভাষণের দুটি আলাদা অংশ থেকে তিনটি উদ্ধৃতি একত্র করে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যেন মনে হয় ট্রাম্প তার সমর্থকদের ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গা সৃষ্টিতে উৎসাহ দিচ্ছেন।
অথচ তার বক্তব্যের বাদ পড়া অংশগুলোর একটিতে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি চান সমর্থকরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করুক।
বিবিসির ওই অনুষ্ঠান প্রচারের পরপরই সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ তোলেন ট্রাম্প। জানান, তাকে নির্বাচনে হারিয়ে দিতেই স্বার্থান্বেষী মহলকে সহযোগিতা করছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি।
সম্প্রতি আরেক বিখ্যাত ব্রিটিশ সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’ ফাঁসকৃত ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করার পর নতুন করে ঘটনাটি আলোচনায় আসে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টও সোমবার ট্রুথ সোশ্যালে দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন শেয়ার করে দুই বিবিসি কর্মকর্তার পদত্যাগকে স্বাগত জানান। তিনি লেখেন, ‘এই দুর্নীতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের মুখোশ খোলার জন্য ডেইলি টেলিগ্রাফকে ধন্যবাদ। যারা পদত্যাগ করলেন তারা খুবই অসৎ। তারা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে চেয়েছিলেন যা গণতন্ত্রের জন্য ভয়ানক।’
এর আগে, পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে বিবিসির মহাপরিচালক টিম ডেভি বলেন, ‘বিবিসি নিখুঁত নয়। আমাদের ভুল হতে পারে, যদিও তা মোটেই কাম্য নয়। আমাদের সবসময় খোলামেলা, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। সাম্প্রতিক বিতর্ক আমার ওই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।’
ডেবোরা টারনেসের ভাষায়, ‘প্যানোরামা বিতর্ক বিবিসির সুনাম ক্ষুণ্ণ করেছে, গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দিয়েছে এবং মানুষের কাছে বিশ্বাসহীনতার বিশাল দেয়াল তৈরি করছে। এ দায় আমার, তাই পদত্যাগ করছি।’


