রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীবাহী একটি বাস পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় স্বজনদের আহাজারি ও ক্ষোভে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। নিখোঁজদের দ্রুত উদ্ধারের দাবিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে ঘাটজুড়ে।
বুধবার বিকাল সোয়া ৫টার দিকে ঘাটের ৩ নম্বর পন্টুন এলাকায় কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসটিতে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। দুর্ঘটনার পর বেশ কয়েকজন সাঁতরে পাড়ে উঠেছেন। তবে অধিকাংশ যাত্রীই নদীতে তলিয়ে যান। এখন পর্যন্ত দুইজন নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বাকিরা নিখোঁজ।
ঘটনার পরপরই স্বজনরা ঘটনাস্থলে ছুটে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ নদীর তীরে দাঁড়িয়ে প্রিয়জনের খোঁজ করছেন, আবার কেউ স্বজনদের মরদেহ ফিরে পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছেন।
এক ভুক্তভোগী জানান, তার পরিবারের পাঁচজন ওই বাসে ছিলেন। তার স্ত্রী, দুই বছরের মেয়ে ও বোন নদী থেকে জীবিত ফিরতে পারলেও সাত বছর বয়সী ছেলে ও ১১ বছরের ভাগনে এখনও নিখোঁজ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার সন্তান তো আর নাই, অন্তত লাশটা আমাকে বুঝিয়ে দেন।’
অনেকেই অভিযোগ করেন, ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করতে দেরি হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয়রা বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিখোঁজদের স্বজনরা শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। স্থানীয় এক কলেজ শিক্ষক ফেসবুকে তার বোনের মৃত্যুর খবর এবং ভাগনে ও নাতির নিখোঁজ হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেও পোস্ট দিয়েছেন। ইলিয়াস মাহমুদ নিরব নামে একজন লেখেন, ‘ফেরির ডিজাইন এমনভাবে করা হয় যেন মৃত্যুফাঁদ হয়ে থাকে! যে জায়গাটা দিয়ে গাড়িটা যাত্রী নিয়ে পড়ে গেল, এখানে রেলিং দেওয়া এক-ফুটের মতো উচ্চতায়! এটা ৬/৭ফুট উচ্চতায় করা হলে হয়ত এই বাসটি পড়ত না! আমাদের পদে পদে মৃত্যুফাঁদ। বেঁচে আছি এটাই ভাগ্য।’
এদিকে ঘটনাস্থলে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, নৌপুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত রয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম দোলন জানান, স্থানীয় ডুবুরি দল উদ্ধার কাজ শুরু করেছে এবং ঢাকার সদর দপ্তর থেকে বিশেষ ডুবুরি দল পাঠানো হয়েছে। তবে ঝড়-বৃষ্টির কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বাসটি শনাক্ত করা গেছে। বিআইডব্লিউটিএ-এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র সহযোগিতায় বাসটি উত্তোলনের চেষ্টা চলছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়া ও নদীর স্রোতের কারণে কিছুটা বিলম্ব হলেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও আশ্বস্ত করা হয়েছে।


