রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা কেবল অতিবৃষ্টি বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নয়; বরং কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাভূমি ভরাট, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার ফল বলে মন্তব্য করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী ও পরিবেশবিদরা। এ সংকট নিরসনে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে নদী, খাল, জলাভূমি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি সাত দফা সুপারিশ তুলে ধরেছেন তারা।
শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত ‘বৃষ্টি নয়, জলাবদ্ধতায় ডুবছে ঢাকা’ শীর্ষক সেমিনারে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে এসব সুপারিশ তুলে ধরেন তারা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাপার সভাপতি নূর মোহাম্মদ তালুকদার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপার নগরায়ন কমিটির আহ্বায়ক স্থপতি ইকবাল হাবিব এবং সঞ্চালনা করেন বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির।
মূল প্রবন্ধে ইকবাল হাবিব বলেন, একসময় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীকেন্দ্রিক খাল ও জলাভূমির নেটওয়ার্ক ঢাকার প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করত। কিন্তু দীর্ঘদিনের দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে সেই ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর গবেষণা অনুযায়ী গত তিন দশকে ঢাকা প্রায় ৮৫ শতাংশ জলাভূমি হারিয়েছে, একই সময়ে নির্মিত এলাকা বেড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। এ ছাড়া রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮০ বছরে রাজধানী থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার খাল বিলুপ্ত হয়েছে।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ১৯৮৮ সালের পরিকল্পনায় বৃষ্টির প্রায় ৪০ শতাংশ পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার হিসাব ধরা হলেও বর্তমানে কংক্রিটে আচ্ছাদিত নগরে তা ১৮ থেকে ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে অধিকাংশ বৃষ্টির পানি এমন একটি ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যা এ পরিমাণ প্রবাহ বহনের জন্য পরিকল্পিতভাবে তৈরি ছিল না।
এ ছাড়া রাজধানীর প্রায় ৪০ শতাংশ কঠিন বর্জ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা যায় না এবং ঢাকা ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা শহরের মাত্র ২০ শতাংশ এলাকায় পৌঁছেছে। প্রতিদিন উৎপাদিত প্রায় ৬০০ মিলিয়ন লিটার পয়োবর্জ্যের মধ্যে মাত্র ১২০ মিলিয়ন লিটার শোধন করা হয়, বাকিটা নদী ও খালে গিয়ে পড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়।
পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আনিসুর রহমান বলেন, যেসব এলাকা ভরাট না করার সুপারিশ ছিল, সেসব এলাকাই ভরাট করার ফলে বর্তমানে জলাবদ্ধতার সমস্যা প্রকট হয়েছে। দায় চাপানোর সংস্কৃতি বন্ধ করে পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
গবেষক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, সমস্যা দেখা দিলেই পরিকল্পনা ও অর্থ বরাদ্দ হয়, কিন্তু কার্যকর বাস্তবায়ন হয় না। তিনি ভূপ্রকৃতি ও পানি প্রবাহ বিবেচনায় নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান।
বাপার সহসভাপতি খুশী কবির বলেন, পরিবেশ, নগর পরিকল্পনা ও জলাবদ্ধতা একই সমস্যার বিভিন্ন দিক। তাই খণ্ডকালীন সমাধানের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে বাপার সহসভাপতি অধ্যাপক ফিরোজ আহমেদ বলেন, উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আলাদা হলেও ড্রেনেজ ব্যবস্থা একটি সমন্বিত কাঠামো। অথচ ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোনো পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র নেই এবং প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলেরও অভাব রয়েছে।
নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক খুরশিদ জাবিন হোসেন তৌফিক বলেন, নগর উন্নয়নে প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করার ফলেই বর্তমান সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে জলাবদ্ধতা কমাতে বিচ্ছিন্ন ড্রেনগুলোকে সংযুক্ত করা, খাল ও ড্রেনে বর্জ্য ফেলা বন্ধে জনসচেতনতা বাড়ানো, পুরোনো ড্রেনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় নতুন ড্রেনেজ নকশা প্রণয়ন জরুরি। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি ও পয়োবর্জ্যের জন্য পৃথক নেটওয়ার্ক, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
সেমিনারে জলাবদ্ধতা নিরসনে সাত দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলো হলো— আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু, পৃথক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, নদী-খাল-জলাভূমিকে সমন্বিত ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’-এর আওতায় আনা, জলাধার ও ক্যাচমেন্ট এলাকা সংরক্ষণ, দখল ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ও নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বাস্তবায়ন।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বিআইপি’র উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক আনিসুর রহমান। এ ছাড়া সেমিনারে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।


