তনু হত্যা মামলা তদন্তে ১০ বছরের প্রহসন

তনু হত্যা মামলা তদন্তে ১০ বছরের প্রহসন
Advertisement
Advertisement

কুমিল্লার বহুল আলোচিত সোহাগী জাহান তনু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে প্রহসন করা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে একের পর এক তদন্ত সংস্থা ও তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হলেও মামলার তদন্তে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। ময়নাতদন্ত থেকে শুরু করে আলামত সংগ্রহ এবং আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে অস্পষ্টতা, সময়ক্ষেপণ ও নয়ছয়ের ঘটনা ঘটেছে।

ঘটনাস্থল কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকা হওয়ায় শুরু থেকেই জনমনে এই ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, এই ঘটনার সাথে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা জড়িত থাকতে পারেন। ফলে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রথম থেকেই গভীর সংশয় ছিল। পরবর্তী সময়ে তদন্ত নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তালবাহানা সেই সংশয়কেই সত্যি বলে প্রমাণ করেছে।

মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে প্রথম কয়েক বছর নিয়োজিত ছিল পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সিআইডি। এরপর ২০২০ সালে তদন্তের ভার দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। তবে তদন্তে বিশেষায়িত এই পুলিশ সংস্থাও দীর্ঘ সময় তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারেনি।

অবশেষে সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে আটকের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ স্থবিরতার অবসান ঘটেছে। পিবিআই কেরানীগঞ্জ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলায় এই প্রথম কোনো অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হলো। ঘটনার পর থেকেই হাফিজুর রহমানসহ তিনজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। দীর্ঘ ১০ বছর পর তাকে আটক করার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে তাকে ধর্ষণের পর হত্যার আলামত পাওয়া গিয়েছিল। তনুর বাবা কুমিল্লা সেনানিবাস বোর্ডে একজন বেসামরিক কর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তারা সেনানিবাসের কোয়ার্টারেই বসবাস করতেন।

তিন ভাইবোনের মধ্যে তনু ছিলেন সবার ছোট। তিনি ছিলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। পড়াশোনার পাশাপাশি তনু কলেজের নাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর সারাদেশের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সাধারণ মানুষ এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানালেও তৎকালীন সরকার ও সেনাবাহিনীর একটি অংশের চাপে তদন্ত কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তে নতুন মোড়

মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই-এর পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, গত ৬ এপ্রিল তাকে আদালতে তলব করা হয়। আদালত তাকে হাজির হয়ে তদন্তের বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।

আরও পড়ুন

আদালতে হাজির হয়ে তদন্ত কর্মকর্তা সন্দেহভাজন তিন ব্যক্তি সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক শাহিনুল আলমের ডিএনএ নমুনা ক্রস-ম্যাচ করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। তার এই আবেদনে আদালত মামলার আলামতের সাথে ওই তিন ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে দেখার আদেশ দেয়।

আদালতের আদেশ পাওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটক করার জন্য অভিযান শুরু করেন। এ বিষয়ে তিনি জানান, মঙ্গলবার রাতে হাফিজুর রহমানকে আটকের পর তার ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করে বুধবার সেই নমুনা পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। তবে সন্দেহভাজন অপর দুই ব্যক্তি তাদের পুরনো ঠিকানায় না থাকায় তাদের আটকের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

বারবার সংস্থা ও কর্মকর্তা বদল

তনু হত্যাকাণ্ডের পর পর্যায়ক্রমে তদন্তের দায়িত্ব পালন করেছেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই মো. সাইফুল ইসলাম এবং ডিবির পরিদর্শক এ কে এম মনজুর আলম। তারা কোনো কুলকিনারা করতে না পারায় পরবর্তীতে সিআইডি কুমিল্লার পরিদর্শক গাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম এবং সিআইডির নোয়াখালী ও ফেনী অঞ্চলের তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহম্মদ দায়িত্ব পান।

সিআইডি তদন্ত চলাকালীন তনুর পোশাকে তিন অজ্ঞাত ব্যক্তির ডিএনএ’র উপস্থিতি খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু সেই সময় সন্দেহভাজনদের সাথে ওই ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হয়নি। এই বিষয়টি নিয়ে তনুর পরিবার শুরু থেকেই আদালতে অভিযোগ করে আসছিল। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২০ সালের অক্টোবরে পিবিআই ঢাকা (সদর দপ্তর) মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে।

তদন্ত নিয়ে বিতর্ক

তদন্ত সংস্থা ও কর্মকর্তা বারবার বদল হলেও কোনো অগ্রগতি না হওয়া এবং কাউকে আটক না করায় নানা বিতর্ক তৈরি হয়। এছাড়া তনুর মরদেহের প্রথম ময়নাতদন্তে ভুল থাকায় পরিবারের আবেদনে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করা হয়। এই বিষয়টি ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি করে।

সিআইডি ১০ বছর আগে ডিএনএ আলামত পেলেও চলতি মাসের ৬ এপ্রিল পিবিআই-এর আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত ৩ জন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যের ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেয়। আদালত সূত্রে জানা গেছে, এই মামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০টি শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। বুধবার বিকালে গ্রেপ্তারকৃত আসামির শুনানির সময় তনুর বাবা ইয়ার হোসেন, মা আনোয়ারা বেগম ও ছোট ভাই রুবেল হোসেন কুমিল্লা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

আসামির ফাঁসি চান তনুর বাবা-মা

হত্যাকাণ্ডের এক দশক পর প্রথম কোনো আসামি গ্রেপ্তার হওয়ায় তনুর মা আনোয়ারা বেগম এখন ন্যায়বিচারের আশা করছেন। মেয়ের হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে তিনি টাইমসকে বলেন, দীর্ঘ ১০ বছর পর একজন আসামি ধরা পড়েছে। তিনি আশা করছেন এবার বিচার পাবেন। তার মেয়েকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তিনি অপরাধীর ঠিক একই শাস্তি অর্থাৎ ফাঁসি চান।

এদিকে আসামিকে কাঠগড়ায় দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বারবার দাবি জানানো সত্ত্বেও এতদিন কাউকে আটক না করে শুধু আশ্বাসের বাণী শোনানো হয়েছে। ১০ বছর পর একজনকে কাঠগড়ায় দেখে তিনি সন্তুষ্ট। আদালত আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে, এতে তিনি আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

তনু হত্যার পর শুধু তদন্ত নিয়ে প্রহসনই করা হয়নি, বরং তনুর পরিবারের উপর বিভিন্নভাবে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তাদেরকে নানা সময় হুমকি দিয়ে ভয়ের মধ্যে রাখা হয়। দীর্ঘদিন ধরে তনুর পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিনাতিপাত করছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad