দেশে জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে জনজীবনে বহুমাত্রিক সংকট দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান। জবাবে আগামী সপ্তাহেই জ্বালানি সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
তিনি সংসদে জানিয়েছেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার আগামী মে মাস পর্যন্ত দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে এবং বর্তমানে জুন ও জুলাই মাসের চাহিদা পূরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
বুধবার ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ৬৮ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তারা।
‘দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট নিরসনে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে অবিলম্বে সরকারের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ’ শীর্ষক ওই আলোচনায় আরও অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং বিরোধীদলীয় সদস্য মো. সাইফুল আলম ও মাসুদ পারভেজ রাসেল।
এ বিষয়ে সংসদে আনীত নোটিশে বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে সারা দেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট চলছে। পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মানুষ জ্বালানি পাচ্ছে না, যার ফলে জনজীবনে বহুমাত্রিক সংকট দেখা দিচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, সারা দেশে যখন জ্বালানির জন্য হাহাকার চলছে, তখন সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সংকটের কথা অস্বীকার করে বিভ্রান্তিকর দাবি জানাচ্ছেন। সরকারের এই বাস্তবতা-বিবর্জিত ও অস্বীকারের প্রবণতা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ করে তুলছে। তাই বর্তমান সংকটের প্রকৃত তথ্য প্রকাশপূর্বক এই সংকট নিরসনে সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত সমাধান জরুরি।’
ওই নোটিশের জবাবে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী সংকট চলছে, যে কারণে কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। আবার এ নিয়ে অসাধু মহলের অপতৎপরতা চলছে। তারপরও সরকারের পদক্ষেপে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরেছে। সরকার জনগণের স্বার্থে ও কৃষকের ভর্তুকি নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ দূরদর্শিতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।’
এরপরও জ্বালানি সংকট নিরসনে কোনো সুপারিশ থাকলে তা নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও তার টিমকে মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর দপ্তরে আলোচনার আমন্ত্রণ জানান তিনি।
বর্তমানে জ্বালানি তেলের যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাকে ‘সংকট’ বলতে রাজি নন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমি এটাকে সংকট বলতে চাই না। বিরোধীদলীয় নেতা দেশব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকটের কথা বলেছেন, কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করতে চাই-জ্বালানির কারণে কি বোরো চাষ ব্যাহত হয়েছে?
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সহনীয় মাত্রায় জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। যদি সংকটই হতো, তবে কি কোনো মিল-ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হয়েছে? চাষাবাদ, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা-বাণিজ্য তো সবকিছুই স্বাভাবিক চলছে। তাহলে সংকট কোথায়?’
জ্বালানি তেলের কালোবাজারি ও মজুত প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোথাও কালোবাজারি বা মজুত হলে সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাগুলোই (র্যাব, পুলিশ, বিজিবি) খুঁজে বের করছে। অনলাইনে তেল বিক্রির কালোবাজারি চক্রকেও ধরা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিন-রাত মাঠপর্যায়ে কাজ করছে এবং প্রতিটি ডিপো ও পাম্পে রুটিনমাফিক তদারকি করা হচ্ছে।
সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচারের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, বর্ডার এলাকায় দাম কম থাকলে কিছু পাচারের প্রবণতা থাকে। তবে সরকার সফলভাবে জ্বালানি তেল বা সিলিন্ডার পাচার রোধ করতে সক্ষম হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কৃতিত্ব অনেকে স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু আমরা সফলভাবে পাচার ঠেকিয়ে দিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা যে পুলিশ কাঠামো পেয়েছি, তাকে রাতারাতি পাল্টে ফেলা সম্ভব নয়। তবে আমরা তাদের ‘মোরালি স্ট্রং’ (মানসিকভাবে শক্তিশালী) করছি এবং জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করছি। বাংলাদেশে আর কোনো ‘মব কালচার’ থাকবে না। অপরাধ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব না হলেও আমরা একটি নজির স্থাপন করতে চাই।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামের সলিমপুর জঙ্গল যা রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল, আমরা তা উদ্ধার করেছি। সুন্দরবন ও সমুদ্র অঞ্চলে দস্যুতা দমনে সফল অভিযান চলছে। সবার সহযোগিতায় সারা দেশে শান্তি বজায় রাখব। তিনি বিরোধী দলকে নেতিবাচক ধারণা প্রচার না করে জাতীয় ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জনগণের সমর্থনে সরকার গঠনের দিন গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ছিল মাত্র সাত দিনের। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় আমাদের আমদানিকৃত তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছিল। তবে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ ও বিকল্প উৎস সন্ধানের ফলে বর্তমানে আমরা একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছি।
তিনি আরও জানান, গত দুই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের মূল্য ১৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় জ্বালানির দাম ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে মাত্র ১০ থেকে ১৬ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করেছে। কৃষকদের সেচের কথা বিবেচনা করে প্রথম ৪৫ দিন সরকার দামই বাড়ায়নি।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত ও পাচারের চেষ্টা চলছে। কোথাও পানির ট্যাংকে, কোথাও ড্রয়িংরুমে আবার কোথাও মাটির নিচে ১০ হাজার লিটার ডিজেল মজুতের খবর পাওয়া গেছে। এমনকি কাভার্ড ভ্যান ও অ্যাম্বুলেন্সে করেও তেল পাচার করা হচ্ছে। এসব অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।
জ্বালানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে সরকার ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল পাস’ চালু করেছে এবং এটি পর্যায়ক্রমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরেছে।


