ঈদের ছুটি শেষেও উত্তরার সেই মেট্রো স্টেশনের নিচে সিটি করপোরেশনের কর্মীদেরকে কাজ করে যেতে হচ্ছে। ইজারার শর্ত ভেঙে হাট বসানোর এই ক্ষত আরও বহুদিন থাকবে সেখানে।
করপোরেশনের প্রশাসক ইজারাদারকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দিলেও আজ অবধি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে মুখ খুলছেন না কেউ।
করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বর্জ্য অপসারণ করলেও এখনো রয়ে গেছে দুর্গন্ধ। আর সেখানকার গাছের যে ক্ষতি হয়েছে, সেটি পূরণে সময় লেগে যাবে আরও কয়েক মাস।
ঈদের আগে উত্তরা সেন্টার স্টেশন থেকে উত্তরা উত্তর স্টেশন পর্যন্ত পুরো এলাকাটি যেন রূপ নিয়েছিল এক বিশাল গোয়ালঘরে। ইজারা না দেওয়া সত্ত্বেও মেট্রোরেলের ঠিক নিচেই দুই পাশে বাঁশ দিয়ে কাঠামো তৈরি করে বসানো হয়েছিল কোরবানির পশুর হাট। যার ফলে মেট্রোরেলের নিচের পুরো পথ জুড়ে জমেছিল পশুর মলমূত্র, খাবার ও আবর্জনা।
গত ২৫ মে ঢাকা সিটি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ওই এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে কর্মকর্তাদেরকে বলেন, ‘৫০ লাখ টাকা জরিমানা করবেন আজকে। এখানে গরু দেখেন কতগুলো আছে, সব ফাইন করেন। লক্ষ লক্ষ টাকা ফাইন করেন আর চার সাইডে উঠায়ে দেন। টাইমও দেবেন, জরিমানাও করবেন। আবার যদি না সরে, আবার জরিমানা করবেন। পলিটিক্যাল লোক আপনার দেখার দরকার নাই।’
তিনি নির্দেশ দেন, ‘এটা ফাঁকা থাকুক, কিন্তু গরু বসবে না। গরু-ছাগল কিছুই দুই সাইডে বসতে পারবে না।’ তবে এই নির্দেশের পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে-এমন কোনো বিজ্ঞপ্তি আসেনি সিটি করপোরেশনের তরফে।
তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, শেষ পর্যন্ত আদৌ কোনো জরিমানা করেছে কি না, তা তার জানা নেই।
সিটি প্রশাসক মিল্টনকে ফোনে পাওয়া যায়নি। ইজারাদার শেখ ফরিদের ফোনও বাজতে থাকলে তিনি ধরেননি।
উত্তর সিটির অঞ্চল-৬-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান ফোন ধরলেও সাংবাদকর্মী পরিচয় পেয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
কথা বলতে রাজি হননি সংশ্লিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারাও। একই বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও কোনো বক্তব্য দেননি।
রোববার উত্তরা সেন্টার স্টেশন এলাকায় দেখা যায়, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কাজ শুরু করেছেন। কেউ পানি ছিটাচ্ছেন, আবার কোথাও হাঁটার পথের পাশে জমে আছে বর্জ্যের স্তূপ।
একজন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্জ্য অপসারণ ও দুর্গন্ধ দূর করতে আজ ১৬০ জন কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে পুলিশ এই কাজ তদারকি করছে।’
দুর্গন্ধ ও বর্জ্য সরাতে দুটি ‘স্প্রে ক্যানন’ দিয়ে পানি ছিটাতে দেখা গেছে। আগের দিনও চারটি স্প্রে ক্যানন ব্যবহার করা হয়েছিল।
বেগম জুলেখা নামে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, ‘অনেক ময়লা পেলাম, আর এত দুর্গন্ধ যা বলার বাইরে। সকাল থেকে আমি একাই প্রায় ২০ ব্যাগের মতো ময়লা তুলেছি।’
তিনি জানান, এখনা কিছু ভাঙা বাঁশের কাঠামো রাস্তার পাশে পড়ে রয়েছে। পুরো বর্জ্য পরিষ্কার করতে আরও সময় লাগবে।
সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের করুণ দশা
মেট্রো স্টেশনের নিচের সড়ক বিভাজকে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য রোপন করা গাছগুলো অনেক স্থানেই তা উপড়ে গেছে। চারাগাছের ওপরেই ফেলা হয়েছে গরুর মলমূত্র।
উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা শরিফ আহমেদ বলেন, ‘হাট সরে গেছে, কিন্তু গন্ধ যায়নি। স্টেশনের নিচে পশু বাঁধা, ট্রাক দাঁড়ানো, অস্থায়ী ঘের—এই কয়দিনের জন্য এলাকাটা হয়ে উঠেছিল খোলা গোয়ালঘর। আর এখন উৎসব শেষ, আমাদের ভোগান্তি চলছে।’
দিয়াবাড়ির বাসিন্দা অনন্যা সরকার বলেন, ‘রুমাল মুখে চেপে গতকাল (পরশু) পর্যন্ত হাঁটতে হয়েছে। এখনো রাস্তার দুই পাশের গাছগুলো অনেক জায়গায় নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে।’
ডিএনসিসি কর্মীরা পশুর বর্জ্য ও মাটির স্তূপ সরিয়ে পুনরায় চারাগাছ রোপণ করছেন।
শনিবার সংবাদ সম্মেলনে ডিএনসিসি প্রশাসক মিল্টন দাবি করেন, মেট্রোরেলকে ঘিরে সরকার ও ডিএনসিসির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
গত ২৭ মে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দাবি করেন, সেখানে হাটই বসেনি। ভারী বৃষ্টির সময় কিছু ব্যবসায়ী সাময়িকভাবে আশ্রয় নিয়েছিল।
মেট্রোরেলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিচে এভাবে হাট বসানোর বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবে দেখছেন নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান।
টাইমসকে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি করতে গেলে দেখাতে হয় যে কার কত পাওয়ার আছে। যদি দৃশ্যমানভাবে হাট দখল করে রাখা যায়, তবে সেখানে প্রচুর দলীয় কর্মী ও মানুষকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়। সব মিলিয়ে এটি শক্তি প্রদর্শনেরও একটি বড় হাতিয়ার।’
‘হাটের ক্ষেত্রে কেবল সরকারদলীয় লোকেরাই এত বিপুল সংখ্যক ইজারা পাচ্ছেন। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা কেন এখানে অন্তত ৩০ শতাংশও নিরপেক্ষ ইজারা দেখতে পাচ্ছি না?’ বলেন তিনি।


