র্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা কর্মকর্তা লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানের একের পর এক হত্যা ও গুমের কথিত অভিযানগুলোর সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা তদন্তের কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তৎকালীন র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের মাধ্যমে পছন্দের কিছু সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে এসব অভিযানে নিয়ে যাওয়া, তাদের ব্রিফ করা এবং পরে সেই অনুযায়ী ঘটনা প্রচারের অভিযোগ রয়েছে। তার ভাষায়, এসব কর্মকাণ্ডে সহায়তা করে থাকলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হতে পারে।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. সাব্বির রহমান ওসমানীর জবানবন্দি গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, সাক্ষী হিসেবে সাব্বির রহমান অত্যন্ত ভয়াবহ তথ্য ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছেন এবং জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে তার জবানবন্দি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আমি মনে করি যথেষ্ট।
আমিনুল ইসলাম বলেন, সাব্বির রহমান নিজে র্যাবের কর্মকর্তা ছিলেন এবং জিয়াউল আহসানের পরিচালিত অনেকগুলো অভিযানের সঙ্গে ছিলেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, জিয়াউল তার নিজস্ব বাহিনীর সদস্যদের এবং আটক ব্যক্তিদের নিয়ে পাথরঘাটার চরদুয়ানীতে যেতেন এবং সেখানে র্যাব-৮-এর সদস্যদেরও এসব অভিযানে ব্যবহার করতেন।
চিফ প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রলারে নিয়ে এসব ব্যক্তিকে হত্যা করা হতো। একটি বালিশ এক পাশে রেখে অন্য পাশ দিয়ে মাথা ও কান বরাবর গুলি করা, এরপর সিমেন্টের বস্তা বাঁধা, পেট কেটে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত পানিতে ফেলে দেওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন সাক্ষী।
সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকারের সময় তারা বিভিন্ন অপকর্মে সহায়তা করেছেন।
তিনি বলেন, তৎকালীন র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের প্রধান পছন্দের কিছু সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমকে এসব অভিযানে আমন্ত্রণ জানাতেন।
ঢাকা থেকে তাদের নিয়ে অভিযানস্থলে যাওয়া হতো এবং পাথরঘাটার চরদুয়ানী পর্যন্ত নেওয়া হতো। তাদের লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হতো এবং যেভাবে ব্রিফ করা হতো, পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো সেভাবেই তা প্রচার করত বলে অভিযোগ রয়েছে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করা কিছু সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমও সমানভাবে অপরাধী এবং তাদেরও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’
তার ভাষায়, এটিও মানবতাবিরোধী অপরাধ। তিনি বলেন, ‘আমি সব সাংবাদিকের কথা তিনি বলছিন না; বরং কতিপয় সাংবাদিকের কথা বলছি।’
চিফ প্রসিকিউটর জানান, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত ইতিমধ্যে চলছে। সাব্বির রহমানের জবানবন্দি সেই তদন্তে সহায়ক হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে সাক্ষী সাব্বির রহমান জবানবন্দিতে কোনো মিডিয়ার নাম বা কোনো সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করেননি বলে জানান আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেন, তৎকালীন যেসব সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি এসব অভিযানস্থলে গিয়েছিলেন, তাদের উপস্থিতির ফুটেজ বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে রয়েছে। এসব ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্তে সহায়তা নেওয়া হবে।
ভয়াবহ তথ্য উপস্থাপন
সাব্বির রহমান ওসমানীর জবানবন্দি সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, প্রত্যক্ষদর্শী ও তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ট্রাইব্যুনালে অত্যন্ত ভয়াবহ তথ্য উপস্থাপন করেছেন।
আমিনুল ইসলামের ভাষ্য, সাক্ষী অনেকগুলো অপারেশনের কথা বলেছেন। জিয়াউল আহসান এসব অভিযান পরিচালনা করতেন এবং নিজের বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ভিকটিমদের বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানীতে নিয়ে যেতেন। সেখানে বরিশালের র্যাব-৮ সদস্যদের এসব অভিযানে ব্যবহার করা হতো।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এসব অভিযানে ট্রলারে নিয়ে ভিকটিমদের মাথা ও কান বরাবর গুলি করা হতো। পরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে পেট কেটে পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। সাক্ষী এসব ঘটনার প্রত্যেকটির সঙ্গে ছিলেন বলে জবানবন্দিতে বলেছেন।
জিয়াকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে
আমিনুল ইসলাম বলেন, সাব্বির রহমান ট্রাইব্যুনালে জানিয়েছেন, তিনি এসব ঘটনা নিয়ে তার অধিনায়কের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, এ ধরনের ঘটনা কীভাবে মেনে নেওয়া যায়।
চিফ প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন অধিনায়ক তাকে বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছু করার নেই। কারণ, জিয়াউল আহসান যা করছেন, তা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতেই করছেন।
অধিনায়কের বক্তব্য উদ্ধৃত করে আমিনুল ইসলাম বলেন, তাকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে? অতএব তাকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। জিয়া যেভাবে চাইবে সেভাবেই হবে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সাব্বির রহমান যেভাবে ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছেন, তিনি র্যাবের একজন কর্মকর্তা ছিলেন এবং অনুশোচনা থেকে শেষ পর্যন্ত বলেছেন যে, এসব ঘটনা মেনে নিতে না পেরে তিনি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন।
আমিনুল ইসলাম বলেন, আমার মনে হয়, জিয়াউলের অপরাধ প্রমাণের জন্য এই সাক্ষীর জবানবন্দিই যথেষ্ট।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অপরাধ
চিফ প্রসিকিউটর দাবি করেন, তার বিশ্বাস, জিয়াউল আহসান রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একের পর এক অপরাধ করেছেন এবং তৎকালীন র্যাবের মিডিয়া উইং কিছু পছন্দের সংবাদমাধ্যমকে এসব অভিযানের সঙ্গী করত।
তার ভাষ্য, সেখানে অপারেশনগুলোকে একটি নাটক মঞ্চস্থ করার মতো করে দেখানো হতো।
আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রসিকিউশনের এই সাক্ষী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণে এটি যথেষ্ট সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।
গলফ অপারেশনে হত্যার অভিযোগ
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সাক্ষীর বর্ণনা অনুযায়ী কয়েকজনকে গলফ অপারেশনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। তাদের পেট কেটে সিমেন্টভর্তি বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
আমিনুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তি বা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জিয়াউল আহসানের সরাসরি যোগাযোগ থাকার কারণে তিনি সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে একের পর এক এসব অপকর্ম করতেন বলে সাক্ষীর বর্ণনায় উঠে এসেছে।
তার ভাষ্য, এ কারণে র্যাবের অন্য কোনো কর্মকর্তা তার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস রাখতেন না।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, যখনই সরকারের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করতেন কেউ, তাদের পাথরঘাটার চরদুয়ানীতে নিয়ে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো বলে সাক্ষীর বর্ণনায় এসেছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, যারা রাজনৈতিক শত্রু ছিলেন, যারা তৎকালীন সরকারের বিরোধিতা করতেন অথবা সরকারের সঙ্গে মতের অমিল ছিল, তাদের তুলে নিয়ে গিয়ে এভাবে হত্যা করা হতো বলে সাক্ষী জানিয়েছেন।


