‘গর্দানের সঙ্গে তরবারির কোনো সংলাপ হয় না’…

‘গর্দানের সঙ্গে তরবারির কোনো সংলাপ হয় না’…
জুলাই অভ্যুত্থানে উত্তাল দিন। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস
Advertisement
Advertisement
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক, বর্তমান স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জন্য সবাইকে নেতৃত্বে আসার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছাত্রলীগ মনোভাবাপন্ন এবং মুজিববাদের মহাবয়ানের অনুরাগী কিংবা আওয়ামী লীগের ভাবাদর্শের উচ্চমূল্যে আস্থাবান অনেকেও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল। আন্দোলন যখন সংঘাতের দিকে গেল এবং আমাদের ভাষায় পরিবর্তন আসতে শুরু করল এবং আমরা যখন একধরনের “খারিজি সংস্কৃতি”র দিকে গিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্যগুলো প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করলাম, আন্দোলন তখন আর আগের জায়গায় রইল না। আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, ১৬ জুলাই ছয়জন এবং ১৭ জুলাই একজন বা দুজন মানুষ শহীদ হওয়ার পরে আন্দোলন আর কোটার দাবির মধ্যে সীমিত করে রাখার উপায় নেই’…এভাবেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক,  বর্তমান স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ শীর্ষক গ্রন্থে অভ্যুত্থানের দিনলিপি তুলে ধরেছেন সজিব ভূঁইয়া। গত মার্চে প্রথমা প্রকাশনের প্রকাশিত বইয়ে ‘কোটা সংস্কার থেকে স্বৈরাচার পতন’ পর্বে গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তুলে ধরেন তিনি।

আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যে বিতর্ক শুরু হলো। একটা পক্ষ বলল, আন্দোলন কোটার দাবির মধ্যেই সীমিত থাকা উচিত। আমাদের পক্ষ এর বাইরেও আরও নানা দাবি সামনে নিয়ে আসছিল, যার একটি ছিল তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ।’

‘১৬ ও ১৭ জুলাই পর্যন্ত আন্দোলন ছিল কোটা সংস্কারের দাবির মধ্যে আবদ্ধ। এর পর থেকে মুখে না বললেও এবং ঘোষণায় না এলেও আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায়। যারা এত দিন আন্দোলন সমন্বয়ের জন্য আমাদের সঙ্গে ছিল, তাদের অনেকেই এই সময়ে আমাদের ছেড়ে চলে যায়। অনেকে আমাদের এড়িয়ে চলতে শুরু করে।’

‘পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে এগিয়ে গেলে আগের মতো সবার সঙ্গে আলোচনা করে কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়-সুযোগ হয়নি। সিদ্ধান্তগুলো তখন কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া শুরু হয়ে যায়। তবে বিভিন্ন পক্ষ থেকে কর্মসূচি নিয়ে নানা রকমের পরামর্শ আসত। নাহিদ ভাই, মাহফুজ ভাই আর আমি যখন যে যাকে পেতাম, আলোচনা করে কর্মসূচিগুলো ঠিক করতাম। বাকিদের গ্রুপে জানিয়ে দেওয়া হতো। আন্দোলন যখন সংঘর্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন থেকেই মনে হচ্ছিল আরও কঠোর জাতীয়ভিত্তিক কর্মসূচির দিকে যেতে হবে। এত মানুষের আত্মত্যাগের আন্দোলন শুধু কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘গোয়েন্দাদের সঙ্গে নাহিদ ইসলামসহ অন্যদের যে বৈঠক হয়, সেখানে বলা হয়েছিল সরকার আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায়। তারপর একটা সংবাদ সম্মেলন করার জন্য গোয়েন্দারা চাপ দিতে থাকে। তারা চাইছিল, সংবাদ সম্মেলন করে যেন বলি যে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার ব্যাপারে আমরা ইতিবাচক। সংবাদ সম্মেলন এড়াতে নাহিদ ভাই বুদ্ধি করে গোয়েন্দাদের বলেছিলেন, আমরা একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেব। তবে এ ব্যাপারে তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। আমাদের মাথায় কেবলই ঘুরছিল, ছয়জন মানুষের আত্মত্যাগ এভাবে বৃথা যেতে পারে না।’

‘হাসনাত আবদুল্লাহ একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লিখে রাত ১১টার দিকে নাহিদ ভাই ও আমাকে দেখিয়ে চূড়ান্ত করে দিতে বলেন। তিনি বললেন, “গোয়েন্দাদের আমরা কথা দিয়ে এসেছি। এটা দ্রুত দেওয়া দরকার।” রাত ২-৩টার দিকে আমরা চূড়ান্ত করে দেওয়ার পর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটা তিনি ফেসবুকে পোস্ট করেন। আমরা কেউ আর সেটা পোস্ট করিনি। বিজ্ঞপ্তিতে হাসনাত আবদুল্লাহ নিজে একটা লাইন যুক্ত করেছিলেন, “সরকার যদি চায়, তাহলে আলোচনার পথ খোলা আছে।” গোয়েন্দা সংস্থার চাপে পড়েই সম্ভবত তাকে এটা করতে হয়েছিল। রাতে ওই লাইনটা আমাদের চোখে পড়েনি। সারা দিনের ক্লান্তিতে আলোচনা করতে করতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি।’…

জুলাই অভ্যুত্থানে প্রতিদিন ঝরছিল তাজা প্রাণ । ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস

আন্দোলনে সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সক্রিয়তার কথা তুলে ধরে আসিফ মাহমুদ আরো বলেন, ‘১৮ জুলাই সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা সরকারকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে। হাসনাত আবদুল্লাহর পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাক্যটা যেভাবে ছিল, তা আরও অতিরঞ্জিত করে টেলিভিশনের স্কুলে প্রচার করা হয়। ডিজিএফআই যা বলছিল, অধিকাংশ গণমাধ্যম তখন তা-ই প্রচার করছিল। আন্দোলনে ছাত্রহত্যার দায় তারা চাপিয়ে দিচ্ছিল আন্দোলনকারীদের ওপর। আমরা বললাম, উদ্ভূত পরিস্থিতি তৈরির দায় সরকারের; আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছি। সরকার কেন গুলি চালাল? পরে হাসনাত আবদুল্লাহ তার পোস্ট সম্পাদনা করলেও ততক্ষণে প্রচার হয়ে গেছে যে আমরা বলেছি, সরকার চাইলে আলোচনা হতে পারে।’

‘সকাল থেকেই ঢাকার যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন জায়গায় গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। আগের দুই দিন আমি শনির আখড়ায় মশিউর রহমানের বাসায় ছিলাম।’

আরও পড়ুন

‘অনেকে তা জেনে গেছে। সকালে তাই ওখান থেকে অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য বের হতে চাইলাম। কিন্তু সবাই আমাদের বেরোতে নিষেধ করল। পরে ভাবলাম, বিচ্ছিন্নভাবে বের হয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে আন্দোলনকারীদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করি। একটা ক্যাপ পরে আমি একদিকে গেলাম, নাহিদ ভাই গেলেন আরেক দিকে।’

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খালি হয়ে যাওয়ার পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্দোলনটি হাতে তুলে নিল। বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মশিউর রহমানের এক ব্যবসায়ী সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে আমি গেলাম গুলশানের দিকে। প্রধান সড়কগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। গণপরিবহন চলছিল না। বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে কিছুটা হেঁটে, কিছুটা রিকশায় করে গেলাম। রাস্তায় কে ছাত্রলীগ, কে আন্দোলনকারী-ঠিকঠাক বোঝা যাচ্ছিল না। বিভিন্ন জায়গায় আগুন জ্বলছে, সংঘর্ষ হচ্ছে। হাতিরঝিল থেকে বাড্ডার দিকের সড়ক পর্যন্ত ব্যাপক সংঘর্ষ চলছিল। আমি বাড্ডা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলাম না। আমার সঙ্গী একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখে এসে বললেন, এদিকের অবস্থা ভালো নয়, অন্য রাস্তা দিয়ে যেতে হবে।’

আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা যেদিকে ছিলাম, পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার একপর্যায়ে কয়েকজন আন্দোলনকারী সে দিকটায় চলে এল। তারাও আমাকে হাতিরঝিল থেকে বাড্ডার রাস্তা দিয়ে যেতে নিষেধ করল। আমি অন্য একটা পথ ধরে গুলশান ১ নম্বরে আমার এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে উঠলাম। ভবনের ১২ তলার বারান্দা থেকে দেখি, নিচের মোড়ে গোলাগুলি চলছে। ছোট ছোট মোড় থেকে শিক্ষার্থীরা বের হচ্ছিল, বস্তি থেকেও ছেলেরা আসছিল। সে সময়ে কথা বলার মতো কোনো প্ল্যাটফর্ম ছিল না। নিজেকে অসহায় মনে হলো। তবে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে মনে সাহস পেলাম।’

‘সেদিন বিভিন্ন জায়গায় ২৯ জনের মতো নিহত হন। আন্দোলন সর্বত্র ছড়িয়ে যায়।

১৬ জুলাই ছয়জন মারা যাওয়ার পর থেকেই আমাদের সংলাপে বসার আহ্বান জানানো হচ্ছিল। গোয়েন্দারা বারবার আমাদের আলোচনায় বসার জন্য চাপ দিতে থাকে। যেকোনো সময় ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যেতে পারে, সেটা অনুমান করা যাচ্ছিল। ১৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ১৮ জুলাই রাত সাড়ে ৮টার দিকে তো ইন্টারনেট বন্ধই হয়ে যায়।’

‘২৯ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর মনে হচ্ছিল, এই আন্দোলনটিকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দিকেই নিয়ে যেতে হবে। ফেরার রাস্তা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গত ১৬ বছরের দুঃশাসন আর গুম-খুনের পরে শেখ হাসিনা এখন তার জুলুমের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাচ্ছেন। আমাদের মাথায় ছিল, আন্দোলনের একটা পরিণত পর্যায়ে গিয়ে এই ঘোষণাটি দিতে হবে। নিজেদের আমরা প্রস্তুত রাখছিলাম। আন্দোলন পরিণত হওয়ার আগেই শেখ হাসিনা পদত্যাগের ঘোষণা দিলে গণ-অভ্যুত্থান হয়তো সফলই হতো না। কারণ, তখনো সবার মনে এমন প্রত্যয় বদ্ধমূল হয়নি যে এমন একটা আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতন ঘটানো সম্ভব। সে সময়ে অনেক সমন্বয়কও সরে যাচ্ছিলেন।’

‘ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমি সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিই। গুলশানে তখন যে বন্ধুর বাসায় ছিলাম, তার বাবা নিরাপত্তার স্বার্থে আমার ফোন নিয়ে যান। ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার দিন রাতে পরের দিনের কর্মসূচি ঘোষণার কথা ভাবছিলাম। কর্মসূচি ঘোষণা করার তাগিদ মাথায় নিয়ে বন্ধুর বাসা থেকে বের হয়ে দূরের একটা জায়গায় গিয়ে নতুন সিম কিনি। এরপর ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সাংবাদিক নূর-এ আলম পিন্টুকে ফোন করি। তাকে বলি, আওয়ামী লীগের নেতা ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং মহিবুল হাসান চৌধুরীর পদত্যাগ, কোটা সংস্কারের এক দফা এবং হত্যা ও গুলির বিচারের দাবিতে পরের দিনও শাটডাউন চলমান থাকবে। আরও কয়েকজন সাংবাদিককে মুঠোফোনে এই বার্তা পাঠাই। নাহিদ ভাই যে এরই মধ্যে অনেককে পরের দিনের কর্মসূচি জানিয়ে দিয়েছেন, সেটা আমার জানা ছিল না।’

‘তখনকার পরিস্থিতি ছিল অদ্ভুত বৈপরীত্যময়। আরেকটা কর্মসূচি দেওয়া মানে আরও মানুষের মৃত্যু, আর কর্মসূচি না দেওয়া মানে এরই মধ্যে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের সঙ্গে বেইমানি করা। আমাদের অনেকের মধ্যে নতুন কর্মসূচি ঘোষণার ব্যাপারে আপত্তি ছিল। আমি, নাহিদ ইসলাম, আবু বাকেরসহ যারা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পক্ষে ছিলাম, তারা নানাভাবে সমালোচিত হচ্ছিলাম। এই সমালোচনা অস্বাভাবিক ছিল না। সমন্বয়ক দলের সবাই যে সেই সময়টাতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল, তা নয়। তা ছাড়া সেখানে অনেকে ছিল সাধারণ শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক ঘটনাক্রম সম্পর্কে যাদের ধারণা অস্পষ্ট ছিল। চারদিক থেকে এমন কথাও উঠছিল যে আমাদের জন্য এত এত মানুষ মারা যাচ্ছে। সরকার ও তাদের অনুগতরাও এমন একটা প্রচারণা চালাচ্ছিল যে আমরা চাইলেই সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারি, মৃত্যু ঠেকাতে পারি। সরকার যেখানে শিগগিরই কোটা সংস্কার করে দিতে চলেছে, তাহলে আর এই কর্মসূচি কেন? কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছিল, আমরা বিএনপি-জামায়াতের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করছি।’

জুলাই অভ্যুত্থানে প্রতিদিন ঝরছিল তাজা প্রাণ । ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস

অগ্নিগর্ভ দিনের কথা স্মরণ করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘এসব মিলিয়ে ধারণা করতে পারছিলাম যে আমাদের ওপর বড় কোনো আক্রমণ আসন্ন। শেখ হাসিনা যেকোনো মূল্যে আমাদের থামাতে চাইবেন। এর মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক সংঘর্ষ চলছিল। খবর পেলাম, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ ক্ষমা চেয়ে পিছু হটেছে। আমরা ভাবছিলাম, এত মানুষ প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার পর এই আন্দোলন শুধু কোটায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার আগে এক ফেসবুক পোস্টে আমি লিখেছিলাম, ‘শহীদ ছাত্র-জনতার রক্তের মূল্য আদায় করছে জনগণ। দেশের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ স্থানই এখন আন্দোলনকারীদের দখলে। পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে খুনি বাহিনী। আমরা খুনি ছাত্রলীগকে হল থেকে বিতাড়িত করেছিলাম। এবার খুনি বাহিনীকে সব জায়গা থেকে পিছু হটতে বাধ্য করছে ছাত্র-জনতা। আপনাদের এই আপসহীন লড়াইকে স্বাগত জানাই। লড়াই জারি রাখুন। যদি নির্দেশনার জন্য আমরা সমন্বয়কেরা না-ও থাকি, যদি মৃত্যু কিংবা গুমের শিকার হই, আন্দোলন থামাবেন না। স্বাধীনতার জন্য নির্দেশনার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন স্পৃহা আর সাহসের।’

‘১৯ জুলাই কোনো খবর পাচ্ছিলাম না। একদিকে ইন্টারনেট বন্ধ, অন্যদিকে আমি যেখানে ছিলাম সেখানে কোনো টেলিভিশন ছিল না। কী হচ্ছে বা হতে চলেছে, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এমন পরিস্থিতিতে বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে গুলশান থেকে বিভিন্ন গলি ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকি আন্দোলন কেমন চলছে। গুলশান ১ নম্বরের মোড় থেকে সামান্য দূরে একটি জায়গায় ব্যাপক সংঘর্ষ হচ্ছিল। বিভিন্ন গলি থেকে সেই চিত্র দেখছিলাম। গলির মুখে গেলেই পুলিশ গুলি করছিল। চারদিকে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। ওই এলাকার প্রধান রাস্তাগুলো সোজা হওয়ায় পুলিশ ফায়ারিং লাইন পেয়ে বহু দূর থেকে গুলি করছিল। আমরা এগোতে পারছিলাম না। মানুষের সীমাহীন সাহস আর স্পৃহা দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম।’

‘১৯ জুলাই সন্ধ্যার দিকে নাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। তিনি বললেন, “আমাদের কেউ কেউ গোয়েন্দাদের সঙ্গে সংলাপে যেতে পারে।” আমি বললাম, তাদের সঙ্গে কেউ আলোচনায় বসলে তাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে বহিষ্কার করে দিতে হবে। কারণ, আমাদের আর ফিরে যাওয়ার পথ ছিল না। এত লাশের ওপর দিয়ে কোনো সংলাপ চলতে পারে না। “গর্দানের সঙ্গে তরবারির কোনো সংলাপ হয় না”–এই লাইনটা মনের মধ্যে বারবার ফিরে আসছিল।’

‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে আমাদের ফেসবুক পেজ এবং “কোটা পুনর্বহাল চাই না” নামের গ্রুপটাসহ অনলাইন নানা কার্যক্রম দেখত আবদুল্লাহ সালেহীন অয়ন। তাকে এ রকম একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রস্তুত করে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল যে শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে সংলাপে যাওয়ার কারণে অমুক অমুক সমন্বয়ককে বহিষ্কার করা হলো। সেই বিজ্ঞপ্তি “নেত্র নিউজে” প্রকাশ করা হয়।’

‘গোয়েন্দা সংস্থা বুঝতে পারল, আমাদের রাজি করানো যাবে না। তারা খুঁজতে লাগল, কাদের রাজি করিয়ে আলোচনায় নেওয়া যায়। নাহিদ ভাই আমার কাছে শঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, “সাবধানে থেকো। আমাদের সঙ্গে যেকোনো কিছু হতে পারে।” তার কণ্ঠ দৃঢ় আর আপসহীন। বললাম, “ভাই, আপনিও সাবধান থেকেন। যা-ই হোক না কেন, আমরা আর ফিরব না।”

‘১৯ জুলাই দিনটা এভাবেই কাটল। সেদিন অনেক মানুষ শহীদ হলেন। সংখ্যাটা তখনো আমি জানতাম না। সেদিন রাতে ফোনের নোটপ্যাডে পরের দিনের কর্মসূচি নোট করলাম। পরে সেটা কাগজে লিখলাম। লেখাটা আমার বন্ধুকে দিলাম তার বাবার অফিস থেকে ফ্যাক্সে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। বড় লেখা পাঠানোর অন্য আর কোনো উপায় ছিল না। পরদিন ২০ জুলাইতেও “কমপ্লিট শাটডাউন” অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছিল। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কী কী অবস্থান নিতে হবে, কর্মসূচিতে তা-ও আরও স্পষ্ট করা হয়। ইন্টারনেট বন্ধ বলে অন্য সমন্বয়কেরা কী করছিলেন, তা জানা যাচ্ছিল না। ফোনে দু-একজনের সঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে কথা হচ্ছিল, কিন্তু আমাদের অবস্থান চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বেশিক্ষণ কথা বলা সম্ভব হচ্ছিল না। অন্য সমন্বয়কেরা কোনো ঘোষণা দিচ্ছেন কি না, সুস্পষ্টভাবে তা বুঝতে পারছিলাম না।’…যোগ করেন আসিফ মাহমুদ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর