আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) সাধারণ মানুষের জন্য আরও সাশ্রয়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তেলে চালিত মধ্যম সারির গাড়ির ওপর উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হচ্ছে করের বোঝা। পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে সরকারের নেওয়া নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এটিকে অন্যতম একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত নতুন পদক্ষেপ অনুযায়ী, ১,২০০ সিসি থেকে ১,৬০০ সিসি ইঞ্জিন ক্ষমতার আমদানি করা তেলে চালিত গাড়ির ওপর সামগ্রিক করের হার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ করা হবে। ডিজেল, অকটেন এবং পেট্রোল চালিত গাড়ির আমদানি ও ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি ক্রেতাদের পরিবেশবান্ধব বিকল্প গাড়ি ব্যবহারে উৎসাহিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই বাড়তি করের প্রস্তাব কার্যকর হলে বাজারে তেলে চালিত গাড়ির দাম বেশ ভালোভাবেই বেড়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে ৩০ লাখ টাকা আমদানি মূল্যের একটি গাড়ির ওপর মোট করের হার বসে ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ফলে বাজারে এর দাম পড়ে প্রায় ৬৯ লাখ ৭১ হাজার টাকা।
প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী, একই গাড়ির দাম পড়বে আনুমানিক ৭৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ, শুধু বাড়তি করের কারণেই গাড়ির দাম বেড়ে যাবে প্রায় ৭ লাখ ৫ হাজার টাকা। তবে এই কর বৃদ্ধি কেবল ১,২০০ সিসি থেকে ১,৬০০ সিসি ক্যাটাগরির গাড়ির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। আমদানি করা অন্যান্য গাড়ির বর্তমান কর কাঠামো অপরিবর্তিত থাকছে।
এর পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ির চলাচল দ্রুত বাড়াতে এবং জ্বালানি তেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে বাজেটে বিশেষ প্রণোদনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় (সিবিইউ) আমদানি করা বৈদ্যুতিক গাড়ির আমদানি শুল্ক একটি স্তরভিত্তিক বা ধাপ অনুযায়ী কমানো হবে। ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর কার্যকর শুল্ক হবে ৬৪ শতাংশ। অন্যদিকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর করের হার বর্তমানের ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮০ শতাংশ করা হবে। এছাড়া ১,৮০০ সিসি পর্যন্ত হাইব্রিড গাড়ির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (রেগুলেটরি ডিউটি) প্রত্যাহার করা হবে, যার ফলে জ্বালানি সাশ্রয়ী গাড়িগুলো সাধারণ মানুষের আরও নাগালের মধ্যে আসবে।
তাছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন, বৈদ্যুতিক বাস এবং ট্রাক আমদানির ক্ষেত্রে উৎস কর পুরোপুরি মওকুফ করা হবে। এই উদ্যোগটি দেশে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অধীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ও নবায়ন করের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আসছে। আগে যেখানে ফ্ল্যাট রেটে ২ লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর (এআইটি) দিতে হতো, তা পরিবর্তন করে এখন গাড়ির ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত গাড়ির জন্য ২৫ হাজার টাকা, ৩০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকা, ৪০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ৭৫ হাজার টাকা এবং ৪০০ কিলোওয়াটের বেশি ক্ষমতার বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য এক লাখ টাকা কর দিতে হবে।
পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের এই প্রচেষ্টা কেবল পরিবহন খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রস্তাবিত বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ (সোলার) খাতের জন্য শূন্য শতাংশ করের মেয়াদ ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য বিদ্যুৎ বিলে ৫ শতাংশ ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সমন্বিত পদক্ষেপগুলোর মূল লক্ষ্য হলো পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে বাংলাদেশের রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করা, ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা এবং সবুজ প্রযুক্তির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা।
বাজেটের এই প্রস্তাবগুলো সরকারের একটি স্পষ্ট নীতিগত দিকনির্দেশনা দেয়, যা হলো প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়িকে আরও ব্যয়বহুল করা এবং বৈদ্যুতিক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচ কমিয়ে আনা।
তবে ১,২০০ সিসি থেকে ১,৬০০ সিসি ক্ষমতার গাড়ির ওপর এই আমদানি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাবের ফলে দেশের বাজারে অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হক।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রযোজ্য মোট ১৩২ শতাংশ করই পার্টস বা যন্ত্রাংশ এনে দেশে জোড়া লাগানো (সিকেডি) গাড়ির তুলনায় অনেক বেশি, যেখানে সিকেডি গাড়ির শুল্ক মাত্র ৪৮ শতাংশের কাছাকাছি। এর ফলে বাজারে ইতোমধ্যে একটি বড় বৈষম্য তৈরি হয়ে আছে।
বারভিডা সভাপতি সতর্ক করে বলেন, এই ভারসাম্যহীনতা রিকন্ডিশন্ড বা ব্যবহৃত গাড়ি আমদানি খাতের ওপর মারাত্মক আঘাত হানবে। তার মতে, করের এই আকস্মিক বৃদ্ধির কারণে গাড়ির দাম আরও বেড়ে যাবে। বিশেষ করে জাপান থেকে আমদানি করা গাড়ির দাম ক্রেতাদের জন্য অনেক বেশি চড়া হয়ে উঠবে।


