গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ সাত দফা দাবিতে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া লংমার্চে নেতাকর্মীদের উসকানিমূলক বক্তব্য না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। পথে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সংযম বজায় রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
শনিবার সকাল ৭টায় ঢাকার বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে সমাবেশ হবে। এরপর সকাল ৮টায় গাড়িবহর যাত্রা শুরু করবে। ঢাকা-মাওয়া সড়ক, ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর হয়ে লং মার্চ খুলনায় পৌঁছাবে। সেখান থেকে যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়া জেলা স্টেডিয়ামে কর্মসূচি শেষ হবে।
শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে জোটের প্রধান দল জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘কর্মসূচিতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য বা স্লোগান দেওয়া যাবে না। পথে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলেও অংশগ্রহণকারীদের গাড়ি থেকে না নেমে ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখতে হবে।’
লং মার্চের কারণে ব্যবসায়ী, সাধারণ পথচারী, দোকানদার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সাময়িক ভোগান্তিতে পড়তে পারেন বলে আগাম ক্ষমা প্রার্থনা করেন জোট নেতা। এ জন্য দুঃখও প্রকাশ করেন তিনি। পরওয়ার বলেন, ‘গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অতীতে দেশের মানুষকে অনেক ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে।’
এটি ১১ দলীয় জোটের তৃতীয় লং মার্চ। এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত লং মার্চ করে সংসদে বিরোধী দলীয় এই জোট।
শুরুতে তাদের দাবি ছিল ছয়টি। এগুলো হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, জ্বালানি ও কৃষি সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধ। পরে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধের দাবিও যুক্ত হয়। পাশাপাশি সরকার পতনের এক দফা দাবিতে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে জোট।
পরওয়ারের অভিযোগ, সরকার গণভোটের রায় অস্বীকার করে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করছে। এ সংকটের সমাধান সংসদেই করতে হবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের ওপর গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। এতে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ৬৮ শতাংশ রায় পড়ে। তবে বিএনপি এখন বলছে, তারা নির্বাচন আয়োজনের স্বার্থে গণভোট মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এটি সংবিধানসম্মত নয়।
পরওয়ার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। গণভোটের অধ্যাদেশ জারির পর নির্বাচন ও সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত বিএনপি কখনো একে সংবিধানবিরোধী বলেনি। এখন ক্ষমতায় গিয়ে গণভোটের রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘একটা ভোটকে ইনজয় করে আপনি প্রধানমন্ত্রী আর এমপি হয়ে গেলেন, আরেকটা অস্বীকার করলেন।’
জামায়াত নেতা বলেন, আগামী ৯ নভেম্বর সংসদের অধিবেশন আবার শুরু হবে। সরকার আন্তরিক হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডেকে বিষয়টি সংসদে নিষ্পত্তি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দল সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেন পরওয়ার। তার অভিযোগ, ‘সরকার একদলীয় ও কর্তৃত্ববাদী মনোভাব নিয়ে এগোচ্ছে। এতে দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্যও সরকারকে দায়ী করেন পরওয়ার। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রায় ২০০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সচিবালয়, জেলা প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন জায়গায় দলীয়করণের অভিযোগ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, ‘অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষ রাখার প্রতিশ্রুতি বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকারে ছিল।’
হাট, ঘাট, বালুঘাট, টেম্পো স্ট্যান্ড ও রিকশা স্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি চলছে বলেও অভিযোগ করেন পরওয়ার। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘শুধু জায়গা আর লোক বদল হয়েছে, দলের নামটা শুধু পাল্টে গেছে। সাইনবোর্ডটা পাল্টে গেছে, কাম একই চলতেছে।’
বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনেও কারচুপির অভিযোগ এনেছে ১১ দলীয় জোট। পরওয়ারের দাবি, প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তারা পরিচয়পত্র বা ব্যাজ ছাড়া দায়িত্ব পালন করেছেন। এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, অন্যের ভোট দিয়ে দেওয়া এবং ফলাফল ঘোষণার আগে ব্যালট বাক্স নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও হয়েছে।
এসব অভিযোগের পক্ষে তথ্য রয়েছে জানিয়ে পরওয়ার বলেন, ‘আমরা এখনো এই ফলাফল সম্পর্কে মন্তব্য করিনি। মাঠপর্যায়ের তথ্য পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ শেষে ফলাফলের বিষয়ে দলীয় অবস্থান জানানো হবে।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর শূন্য হওয়া আসনের উপনির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সুবিধা করতে পারেনি। বিএনপির প্রার্থীর কাছে দলটির প্রার্থী ১ লাখ ৩১ হাজার ৪০৪ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন।


