আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তের প্রেক্ষাপটে আগামী জাতীয় বাজেটে আয়কর, স্থানীয় ভ্যাট (মূসক) ও কাস্টমস শুল্ক খাতে বিদ্যমান কর অব্যাহত একটি বড় অংশ প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সিডিউলভুক্ত এবং এসআরওর মাধ্যমে দেওয়া এসব অব্যাহতি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা মনে করছেন, এসব অব্যাহতি তুলে নিলে অতিরিক্ত প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হতে পারে।
তবে অত্যাবশ্যকীয় কৃষিপণ্য এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ থাকা পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে বিদ্যমান অব্যাহতি এই প্রত্যাহার তালিকার বাইরে রাখা হতে পারে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।
এ লক্ষ্য সামনে রেখে অব্যাহতির তালিকা পর্যালোচনায় তিনটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। কোন কোন খাতের অব্যাহতি বাতিল করা হবে, তা যাচাই-বাছাই করছে কমিটিগুলো। আগামী ২০ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩০০টি পণ্য ও সেবার ওপর নতুন করে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটি আরোপ হতে পারে, ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, অনেক ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে দেওয়া কর অব্যাহতিগুলো দীর্ঘদিন ধরে বহাল রয়েছে। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায়ও কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান কর সুবিধা পেয়েছে, যার সুফল ভোক্তা বা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছায় না। এসব অব্যাহতি বাতিলের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
তাদের হিসাব অনুযায়ী, রপ্তানিমুখী শিল্পের মাত্র ৩০ শতাংশ কর দেয়, আর বাকি ৭০ শতাংশ বিভিন্ন প্রণোদনা ভোগ করে। এ বিষয়েও আগামী বাজেটে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সরকার নির্ধারিত ভ্যাট বা কর হারের বিপরীতে যে পরিমাণ ছাড় দেওয়া হয়, সেটিই সরকারের ‘ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার’ বা কর-ছাড় হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে এই ছাড় রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস শুল্ক খাতে রাজস্ব ছাড়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৬৬ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে কাস্টমস শুল্ক ছাড় ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা, আয়কর ছাড় ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা এবং ভ্যাট ছাড় ছিল ৩১ হাজার কোটি টাকা। একই অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৩ দশমিক ২৫ লাখ কোটি টাকা।
২০২২ সালে আইএমএফের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদিত হয়, যার মধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যে ছাড় করা হয়েছে। তবে সংস্কার কার্যক্রমে অগ্রগতি ধীর হওয়ায় এক পর্যায়ে ঋণের কিস্তি স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও ঋণ ছাড় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে এ হার ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যা আগামী অর্থবছরে ৯ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমুখী চাপে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ রয়েছে, এবং বিনিয়োগও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না।
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি ও বৈদেশিক খাতে নতুন চাপের আশঙ্কার মধ্যে ব্যাপকভাবে কর অব্যাহতি প্রত্যাহার করলে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
তার মতে, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের শর্ত অনেক সময় বাংলাদেশের বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান, কার্যকর অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন।
বর্তমানে কৃষি ও খাদ্যপণ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতি বহাল রয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ইপিজেড, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগকারীদের জন্যও কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। রেমিট্যান্স আয়ের ওপরও শতভাগ কর অব্যাহতি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর-ছাড় কমানো প্রয়োজন হলেও তা একবারে তুলে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। হঠাৎ করে সব অব্যাহতি বাতিল করলে সংশ্লিষ্ট খাতে করের চাপ বাড়বে, যার প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর পড়তে পারে।
শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, ‘হঠাৎ করে সব কর অব্যাহতি তুলে নেওয়া যৌক্তিক হবে না। এতে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হবে, আর ছোটগুলো টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।’ তিনি ধীরে ধীরে ‘সানসেট ক্লজ’-এর মাধ্যমে কর সুবিধা প্রত্যাহারের পরামর্শ দেন।
এনবিআরের সদস্য (কর নীতি) মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, সব কর অব্যাহতি একযোগে প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়। কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে, যা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বহাল রাখতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় কিছু অব্যাহতি রাখা প্রয়োজন।
তিনি জানান, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে কর অব্যাহতির সামগ্রিক পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে স্বাভাবিকভাবেই রাজস্ব আদায় বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।


