পদ্মার চর: বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক ভিন্ন জগত

পদ্মার চর: বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক ভিন্ন জগত
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় প্রমত্তা পদ্মা নদীর বুকে চরাঞ্চলের মানুষের জীবন মানেই এক নিরন্তর সংগ্রাম। বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তায় শুরু হয়  এখানকার প্রতিটি সকাল। নদীভাঙন, চরম দারিদ্র্য আর যোগাযোগহীনতার সঙ্গে লড়াই করেই এ অঞ্চলের মানুষকে টিকে থাকতে হয়।

পদ্মার ভাঙন এখানে এক নিষ্ঠুর চক্রের মতো কাজ করে। একদিকে নদী জমি কেড়ে নেয় আর অন্যদিকে নতুন চর জাগিয়ে তোলে। তবে এই নতুন চর পাওয়ার আনন্দের চেয়ে ভিটেমাটি হারানোর বেদনা অনেক বেশি ভারী। অনেকেই নিজের শেষ সম্বল হারিয়ে এক দশক ধরে অপেক্ষা করেন একটুখানি আশ্রয়ের জন্য।

চর জেগে উঠলে মানুষ নতুন আশার আলো দেখে সেখানে বসতি গড়ে তোলে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে ঘিরে শুরু হয় প্রকৃতির সঙ্গে আরেক যুদ্ধ। চরের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি এবং মাছ ধরা। এই দুটি পেশাই সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে খরা বা আকস্মিক ভাঙনে মুহূর্তের মধ্যে তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

বর্ষা মৌসুম এলেই চরাঞ্চল জুড়ে আতঙ্কের ছায়া নামে। পানির স্রোত বাড়ার সাথে সাথে ঘরবাড়ি তলিয়ে যায় এবং মানুষ আশ্রয়ের খোঁজে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ায়। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে অনেক পরিবারকে সাময়িকভাবে অন্যত্র সরে যেতে হয়।

শিবচরের চরাঞ্চলে যাতায়াতের প্রধান সংকট পাকা রাস্তার অভাব। এখানকার মানুষের যাতায়াতের  প্রধান ভরসা নৌকা। বর্ষাকালে উত্তাল নদী পাড়ি দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই যাতায়াত সমস্যার কারণে জরুরি প্রয়োজনে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। এমনকি শিক্ষার্থীরাও ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারে না।

চরজানাজাত, কাঠালবাড়ি ও মাদবরের চরের মানুষগুলো এখনো বিদ্যুৎ এবং বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। চরজানাজাত ইউনিয়নের বাসিন্দা আলি ফকিরের জীবনের গল্পটা খুব কষ্টের। তিনি জানান, নৌকা ছাড়া তাদের চলার কোনো বিকল্প নেই। সঠিক সময়ে চিকিৎসার অভাবে ছোটখাটো রোগও এখানে বড় হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

কাঠালবাড়ি ইউনিয়নের সুজাই চৌকিদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, তাদের এই অমানবিক কষ্টের কথা কেউ দেখে না। তারা প্রতিবছর ভাঙনে ঘর হারিয়ে আবার নতুন করে জীবন শুরু করেন। কিন্তু উন্নয়নের ছোঁয়া তাদের জনপদে এখনো পৌঁছায়নি।

একই এলাকার সোহেল ব্যাপারী একাধিকবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। তিনি এখন অন্যের জমিতে চাষাবাদ করে ও মাছ ধরে সংসার চালান। তার মতে, চরের মানুষ যেন এক আলাদা জগতে বাস করে। যেখানে নাগরিক মৌলিক সুবিধাগুলো পাওয়া এখনো তাদের কাছে একটি বড় স্বপ্ন।

চরাঞ্চলের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও অনেক উদ্বেগজনক। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় চরের শিশুরা অল্প বয়সেই পড়াশোনা ছেড়ে উপার্জনের সন্ধানে নেমে পড়ে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়।

কলেজছাত্রী মিম আক্তারের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে একরাশ আক্ষেপ। তিনি বলেন, চর থেকে উপজেলা সদরে গিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করা প্রায় অসম্ভব। তিনি মনে করেন, এই পিছিয়ে পড়া জনপদে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন।

চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তারা মনে করেন টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সেই সঙ্গে চরের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।

সচেতন মহলের মতে, চরের মানুষের দুর্ভোগ কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা না করলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে। সেই সঙ্গে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়াও জরুরি।

পদ্মার এই বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল যেন বাংলাদেশের এক ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এখানে প্রতিদিন বেঁচে থাকা মানেই একটি নতুন যুদ্ধ জয় করা। বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করা না গেলে এই বিশাল জনপদের ভাগ্যবদল সম্ভব নয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad